হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম বই রিভিউ

হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম
হুমায়ুন আহমেদ

লেখক পরিচিতি-
জন্ম: ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮,নেত্রকোণা জেলা,গ্রাম কুতুবপুর।
আত্মপ্রকাশ : নন্দিত নরকে (নিম্নবিত্ত এক পরিবারের যাপিত জীবনের আনন্দ-বেদনা,নিয়ে নির্মিত)
ভ্রমণকাহিনী,রুপকথা,শিশুতোষ, কল্পবিজ্ঞান, কলামসহ সাহিত্যের বহু শাখায় বিচরণ।
মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক: জোছনা ও জননীর গল্প, ১৯৭১,আগুনের পরশমনি,শ্যামল ছায়া,নির্বাসন।
পেশা: লেখক,নাট্যকার,চলচ্চিত্রকার,শিক্ষক।
জনপ্রিয় চরিত্র হিমু এবং মিসির আলীর স্রষ্টা।
পুরস্কার: একুশে পদক,বাংলা একাডেমি পুরষ্কার, শিশু একাডেমি পুরষ্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পুরষ্কার, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক,অতীশ দীপংকর স্বর্ণপদক প্রভৃতি।
মৃত্যু :১৯ জুলাই ২০১২

পৃষ্ঠা : ১২৫
মূল্য :২০০ টাকা মাত্র
অন্বেষা প্রকাশন, ২০০৯
ব্যক্তিগত রেটিং :৮/১০

একটু হিমু

হুমায়ুন আহমেদ এর হিমু চরিত্র সম্পর্কে আমরা কমবেশি বিস্তর সবাই জানি। হিমুরা অনেক অদ্ভুত ধরনের।তারা হলুদ পাঞ্জাবী পরিধান করেন।তাদের নীল আকাশ,বৃষ্টি পছন্দ। তাদের জোছনা পছন্দ। তারা কাউকে নীলপদ্ম দেয় না।তারা বড়ই নিজ খেয়ালখুশি মতন চলা লোক।তাদের জীবন কোন মায়াতেই আটকে না।

কাহিনির বিষয়বস্তু

কাহিনি শুরু হয় হিমুর নীল আকাশ দেখার মধ্য দিয়ে।হিমুর আজ নীল আকাশ থেকে শুরু করে কালো কাকটাকেও অনেক সুন্দর লাগছে।হিমু বড়ই পাগলাটে স্বভাবের মানুষ। নিজের ইচ্ছে মতন,,নিজের চিন্তা ভাবনার মতন পৃথিবীটা সাজিয়ে নিয়েছে।

তখন দেশে হরতাল অবরোধ।হিমু এই হরতাল অবরোধের মধ্যেও পথে বের হয়ে গেছে। সে বড়ই উলটা পালটা স্বভাবের মানুষ। গাড়ি তে দেয়া আগুন থেকে সে সিগারেট জ্বালাতে চায়।তাতে নাকি তার অনেক আগ্রহ!!

চলার পথে মারিয়া নামক এক মেয়ের সাথে দেখা। মারিয়ার কথোপকথন থেকে আমরা জানতে পারি,হিমু বেশিদিন এক জায়গায় থাকে না।কিছুদিন পর পরই বাসা পরিবর্তন করেন।কিশোর কালে মারিয়া হিমুকে এক চিঠি দিয়েছিল তবে সেটা আমার আপনার মতন সহজ সরল ভাষায় না।সেটা ছিল সাংকেতিক আবহে। যে চিঠির উত্তর না দিয়েই হিমু হাওয়া হয়ে গেছিল। কারণ হিমুরা এমনই। কোন মায়াই তাদেরকে আটকে রাখতে পারে না।সব মায়া ত্যাগ করে হলুদ পাঞ্জাবী পরিধান করে হিমুরা চলতে থাকে পথের পর পথ।

হিমুকে কেউ কোন কিছু জিজ্ঞেস করলে বরাবরই সে অদ্ভুত উত্তর দিত। যেমন –
আপনার ঠিকানা কি? স্থায়ী ঠিকানা?
আপনি অবশ্যই একটা গ্রামের নাম বলবেন যেখানে আপনি জন্ম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু হিমুকে এই কথা জিজ্ঞেস করলে সে বলবে ”আমার স্থায়ী ঠিকানা হলো ’ পৃথিবী ’। বড়ই অদ্ভুত এই হিমুরা!!

মারিয়া হিমুর প্রতি বরাবরই অকুল আবেদন পেশ করলেও হিমু যেন পাথর। তার যেন মায়া মমতা কিছু নেই।প্রেম বলে তার মনে কিছুই নেই।একদমই যে নেই তেমন না,,হিমুদের অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে যার দৌলতে তারা নিজের মন কে অদ্ভুতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
বইটির ১০৭ পৃষ্ঠায় একটি বাক্য আছে এরকম ”যেসব মানুষ সীমাহীন আবেগ নিয়ে জন্মেছেন, তারা কখনো তাদের আবেগ প্রকাশ করেন না। তাদের আচার-আচরণ রোবটধর্মী।”
যেহেতু হিমুর আচার-আচরণ পুরোটাই রোবটময়,,তাহলে আমরা ধরতেই পারি হিমু সীমাহীন আবেগ নিয়ে জন্মেছেন।

কাহিনির শেষদিকে এসে আমরা প্রেমের নতুন অর্থ দেখি।এখানে নীলপদ্ম শব্দটি প্রায়ই ব্যাবহার করা হয়েছে। মূলত নীলপদ্ম মূলত এখানে ভালোবাসা,প্রেম,প্রেমময় মনকে ধরতে পারি।যেমন হিমু নীলপদ্মের থিউরি থেকে বুঝতে পারে,,মারিয়া তার মনের সকল দখল হিমু নামক এই মহাপুরুষ কে দিয়েছে।মারিয়া বড় দুঃখে কষ্টে জীবন বাহিত করছে,,যে দুঃখ কষ্ট থেকে তার কোন রেহাই নাই,,হিমু মাঝে মাঝে ভাবে তার মহাপুরুষ হওয়া লাগবে না,সে বরং স্বাভাবিক মানুষ হয়ে মারিয়ার পাশে এসে বসুক।মারিয়ার হাতটা একটু ধরুক।কিন্তু সেই আশা অধরা রেখে হিমু হাঁটতে থাকে ক্লান্তিহীন পথ।কারণ তার যে মহাপুরুষ হতেই হবে!

ব্যক্তিগত মতামত

হুমায়ুন আহমেদ এর সৃষ্টি চরিত্র হিমু। একজন হুমায়ুন ভক্ত হিসেবে প্রত্যেকের ই উচিত হিমু সিরিজ এর সবগুলো বই পড়া।হিমু এক অসীম সাহসী চরিত্র। যে নিজেকে, নিজের মনকে খুব শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।এমনটাই হওয়া উচিত।তবে মাঝে মাঝে এই হিমু চরিত্রটার উপর খুব বিরক্তবোধ ও জন্মায়। কারণ টা খুব পরিষ্কার। নিজের মন কে কষ্ট দিয়ে মহাপুরুষ হওয়া কি খুব জরুরি। আর মহাপুরুষ কি নিজের মনের কথা শুনে হওয়া যায় না? পাঠকদের কাছে প্রশ্ন রেখে গেলাম!!

Leave a Comment