হারমনি ওএস এর সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

হারমনি ওএস এর সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

১৬ ই ডিসেম্বর, হুয়াওয়ে তাদের নতুন অপারেটিং সিস্টেম হারমনি ওএস ২.০ বেটা রিলিজ করেছে

এই ভার্সনটি মূলত স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট কে টার্গেট করে ডেভেলপ করা হয়েছে। ২০২১ সালে এটির বাজারে আসবে। নতুন এই অপারেটিং সিস্টেমটি অ্যান্ড্রয়েড এপ সাপোর্ট করতে সক্ষম, কেননা হারমনি ওস একটি টু-ইন-ওয়ান অপারেটিং সিস্টেমের সুবিধা অফার করছে! এছাড়াও আগামী বছরের শেষের দিকে হুয়াওয়ে তাদের ডেস্কটপ ও ল্যাপটপেও উইন্ডোজের পরিবর্তে হারমনি ওএস ব্যবহার করবে। আমরা হয়ত ইতিমধ্যে অনেকেই জানি যে হারমনি ওএস একটি ইউনিভার্সাল ডিস্ট্রিবিউটেড অপারেটিং সিস্টেম, যেটি স্মার্টওয়াচ থেকে শুরু করে কম্পিউটার, সবখানেই কাজ করতে পারে- যেটাকে বলা হচ্ছে “One Operating System for Every Device”
হুয়াওয়ে অবশ্য এটাকে অবিহিত করছে “An Operating System For Internet Of Everything” হিসেবে!

গুগলের অ্যান্ড্রয়েড ওএস হুয়াওয়ের ডিভাইস গুলোতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্কিন সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারনে হুয়াওয়ে তাদের নিজস্ব ইকো-সিস্টেমকে দ্রুত এগিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার এমনই প্রভাব ছিল যে, হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেন ঝেংফেই জুন 2019 সালে ঘোষণা করেছিলেন যে 2019 এবং 2020 সালের মধ্যে তাদের আয় প্রায় 100 বিলিয়ন ডলার হ্রাস পাবে! সেসময় বেশ উৎকন্ঠতা ও চাপ থাকা সত্ত্বেও হুয়াওয়ে কিন্তু অসাধারণ ভাল করেছে। হুয়াওয়ে ২০২০ সালের থার্ড-কোয়ার্টার পর্যন্ত আয় করেছে ৬৭১.৩ বিলিয়ন ইউয়ান, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৯ শতাংশ বেশী।


হুয়াওয়ে নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করার সাথে সাথে এটি প্রয়োগ করার জন্যেও দারুন উদ্যোমে কাজ করে চলছে

মূলত, হুয়াওয়ের উপরে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার আসল উদ্দেশ্য ছিলো চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্নরকম প্রতিবন্ধকতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে তাদেরকে পিছিয়ে ফেলা। কিন্তু হুয়াওয়ে শত প্রতিবন্ধকতা থাকা স্বত্বেও দারুনভাবে সব মোকাবিলা করছে এখন পর্যন্ত! হুয়াওয়ে ইতিমধ্যেই অনেকগুলো সেরা হার্ডওয়্যার বাজারে এনে ভালো রকমের সাড়া পেয়েছে এবং এখন এটি সফটওয়্যার বাজারে প্রতিযোগিতার জন্যও বেশ ভালোভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। হুয়াওয়ে যদি সফল হয় তাহলে ট্রাম্পের নেয়া পদক্ষেপ গুলো বুমেরাং হয়ে আমেরিকান টেক ইন্ডাস্ট্রির জন্যই বড় রকমের হুমকি হতে পারে!

যদিও হারমনি ওএস এখনও পুরোপুরি ভাবে বিকাশিত হয়নি

অবশ্যই একটি নতুন সফটওয়্যার-এনভায়রনমেন্ট তৈরি করা বিশাল রকমের কঠিন কাজ, তবুও হুয়াওয়ের এক্ষেত্রে সফল হবার অনেকগুলো কারন রয়েছে। হুয়াওয়ে প্রতিবছর গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। ২০১৯ সালে হুয়াওয়ের R&D বাজেট ছিলো ১৫.৩ বিলিয়ন ডলার! এবং চলতি বছরে এই ব্যায়। ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। অর্থ্যাৎ গবেষণা ও ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে হুয়াওয়ের এই শীর্ষ অবস্থান, হুয়াওয়ের জন্য একটি অনেক বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে বারংবার।


নতুন একটি অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করা একটি মারাত্মক ঝুকিপূর্ন পদক্ষেপ

বিশেষত যেহতু এটির জন্য হাজার হাজার ডেভেলপারদের নতুন করে অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করার দরকার হয়, যেটি কিনা যেকোনো ইকো-সিস্টেমের জন্য সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে মাইক্রোসফটের মতো একটি টেক-জায়ান্টের উদাহরণ টানা যেতে পারে। মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ মোবাইল ওএস শুধুমাত্র মোবাইল প্ল্যাটফর্মের জন্য যথেষ্ট এপের অভাবের কারণে ব্যর্থ হয়েছিল। উইন্ডোজ মোবাইল ওএস ব্যবহারকারী খুব কম থাকায় মাইক্রোসফট ডেভেলপারদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি। ফলে এন্ড্রয়েডের মতো প্রতিষ্ঠিত ইকো-সিস্টেমের সামনে উইন্ডোজ মোবাইল ওএস এর ব্যর্থতা অনিবার্য হয়ে গিয়েছিলো।


যদিও এক্ষেত্রে হুয়াওয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে

আমেরিকা বলতে গেলে হুয়াওয়ের সামনে আগানোর সমস্ত রাস্তাই বন্ধ করে দিয়েছে, তাই হুয়াওয়ের টিকে থাকার জন্য নতুন ইকোসিস্টেম তৈরি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, তাতে করে হুয়াওয়েকে কিছুটা সময়ের জন্য ক্ষতির মুখ দেখতে হলেও এটিই তাদের একমাত্র পথ এই মূহূর্তে। এছাড়াও উইন্ডোজ ওএস এর থেকে হারমনির বড় একটি পার্থক্য হলো এটি অ্যান্ড্রয়েড এপ্লিকেশন সমর্থন করে। তাই যতদিন হারমনির নিজস্ব এপ ইকো-সিস্টেম সমৃদ্ধ না হচ্ছে ততদিন এটি এন্ড্রয়েড ইকো-সিস্টেমের সাথে খাপ খাওয়াতেও পারবে। তাই হারমনি এক্ষেত্রে উইন্ডোজের মতো অতটা রিক্সি পজিশনে নেই! এছাড়াও হারমনিতে উইন্ডোজ ডেস্কটপ এবং আইওএস এপসও পোর্ট করার সুবিধা রয়েছে। তাই এটিও অনেক বড় একটি প্লাস পয়েন্ট হারমনির জন্য।

এছাড়াও হুয়াওয়ের হারমনি ওএস সফল হবার জন্য আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে


প্রথমত, চীনের হোম মার্কেটে হুয়াওয়ের অপ্রতিদ্বন্দী অবস্থান এবং চীনের সরকারসহ সাধারণ কঞ্জুমারের নিরুঙ্কুশ সমর্থন হুয়াওয়ের প্রতি। চীনের ডোমেস্টিক মার্কেট একাই পুরো পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ! তাই বলা হয়ে থাকে, যে কোম্পানী চীনের বাজারে জায়গা করে নিতে পারে, সে বৈশ্বিক বাজারের একটা ভালো অংশ এমনিতেই দখল করে বসে থাকে! এটি হুয়াওয়ের জন্য একইসাথে অনেকবড় আশা ও শক্তির জায়গা। চীনা গ্রাহকদের কোনও বিদেশী অপারেটিং সিস্টেম সমৃদ্ধ ডিভাইস কেনার চেয়ে তাদের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেমকে সমর্থন করার সম্ভাবনা প্রকট, যা চীনা ডেভেলপারদের হারমনির অ্যাপস তৈরির জন্য যথেষ্ট উৎসাহ দেওয়ার চেয়ে আরও বেশি কিছু দেবে। প্রকৃতপক্ষে, ইতিমধ্যে ১০০,০০০ এরও বেশি সফটওয়্যার ডেভেলপার হারমনি ওএস প্রকল্পে অংশ নিয়েছে এবং হার্ডওয়্যার পার্টনারও ০৫ থেকে ১০ এ বেড়েছে।

BEIJING, CHINA – OCTOBER 15: People visit the Huawei stand during PT Expo China (PTEXPO) at China National Convention Center on October 15, 2020 in Beijing, China. (Photo by VCG/VCG via Getty Images)


অবশ্যই এটি কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়

যা চীনা গ্রাহকদের হুয়াওয়েকে সাপোর্ট করার দিকে প্রভাবিত করে; চীনা গ্রাহকদের বেশীরভাগেরই স্পষ্ট অনুভূতি রয়েছে যে হুয়াওয়ে ও চীনের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তারা নিজেরাও বর্তমান মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক অন্যায় আচরণের শিকার হয়েছে, বিশেষত হুয়াওয়ের সাথে যা হয়েছে তা মারাত্মক রকমের অন্যায়। তাই হুয়াওয়ের যেকোনো প্রোডাক্ট কেনা ( যেটি নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত প্রযুক্তিসমৃদ্ধ হয়ে থাকে ) নিজের জায়গা থেকে দেশকে সমর্থন করার একটি রূপক হিসেবে পরিণত হয়েছে!

দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, হারমনি ওএস চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব ভিত্তিক প্রযুক্তি, যেমন ফাইভ-জি, এআই, এবং ইন্টারনেট অফ থিংস-এর যুগে তৈরি হয়েছে। এবং এই যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘ Seamless Connectivity’ . আর হারমনিওএস এর ভিত্তিই হলো এই Seamless Connectivity. This is undoubtedly a Operating System designed for a new era!


এপল ও মাইক্রোসফটের কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেম বাজারে পুরোপুরি রাজত্ব থাকা স্বত্বেও গুগলের নতুন এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম সফল হয়েছিলো, কেনোনা গুগলের এন্ড্রয়েড ছিলো মোবাইল কম্পিউটিং এর উপর ভিত্তি করে তৈরি করা এবং স্মার্টফোনের আবির্ভাব কনজুমারদের টাচস্ক্রিনেই কম্পিউটার ব্যবহারের সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা দিতে সক্ষম হয়েছিলো। ফলে এন্ড্রয়েড একটি নতুন যুগান্তরকালীন সময়ে অত্যন্ত সফল একটি অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলো।


একইভাবে, হুয়াওয়ের হারমনিওস কেবলমাত্র মোবাইল ফোন বা ট্যাবলেটের জন্য কোনো ইকো-সিস্টেম তৈরি করার বিষয়ে নয়

এটি মূলত একটি নতুন যুগের জন্য ডিজাইন করা এমন একটি ইকো-সিস্টেম যেখানে সকল ডিজিটাল ডিভাইসই একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত থেকে একে-অন্যের সাথে সমন্বয় করে কাজ করবে। বর্তমানের প্রচলিত অপারেটিং সিস্টেমগুলো এই নতুন ধরনের কম্পিউটিং এর ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য আদর্শ নয়। একারনে যুগের চাহিদা বিবেচনায় স্বয়ং গুগল ও মাইক্রোসফট তাদের প্রতিষ্ঠিত Android ও Windows অপারেটিং সিস্টেমকে যথাক্রমে FuchsiaOS এবং Windows CoreOS এর মাধ্যমে রিপ্লেস করার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে হুয়াওয়ে তাদের থেকে এগিয়ে রইলো।

ইতিমধ্যেই Midea, Joyoung ও Robam Appliances এর মতো বড় স্মার্ট হোম এপ্লায়েন্স প্রস্তুতকারক কোম্পানীগুলো তাদের প্রোডাক্টে হারমনিওএস ব্যবহার শুরু করে প্রচুর পন্য বাজারে আনতে শুরু করেছে।

এছাড়াও হুয়াওয়ে চীনা স্মার্টফোন কোম্পানীগুলোর সাথে কোলাবোরেশন করার বিষয়ে কাজ করছে, যাতে কোম্পানীগুলো তাদের স্মার্টফোনে হারমনি ওএস ব্যবহার করে। যদি হুয়াওয়ে এটি করতে সক্ষম হয়, তাহলে হুয়াওয়ে তাদের অপারেটিং সিস্টেম প্রতিষ্ঠার দৌড়ে অনেকটুকু এগিয়ে যাবে সেটি নিঃসন্দেহে বলে দেয়া যায়।


সবকিছুর পরেও, কোনো কিছু নিশ্চিত করে বলার জন্য এখনও উপযুক্ত সময় আসেনি

হারমনি ওএস

It’s still early days. চীনের উন্নতির বিষয়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর স্পষ্টতই অনেক সংশয় রয়েছে। রয়েছে সামনে আগানোর পথে প্রচুর বাধা সৃষ্টি করার অভ্যাস। এটি হুয়াওয়ের ফোনের হার্ডওয়্যার এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তির সাথে ঘটেছিল। হুয়াওয়ের অভাবনীয় উন্নতিতে পশ্চিমীরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলো, পিছিয়ে পড়েছিলো এবং এই অগ্রযাত্রা ব্যহত করার জন্য তারা একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি সহ নিজেদের ক্ষমতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, আর এক্ষেত্রে তারা আংশিক সফলও হয়েছে। তাই প্রযুক্তিগত ভাবে না হলেও বিশ্ব-রাজনীতির মারপ্যাঁচে আর বৈশ্বিক প্রভাব খাটানোর দ্বন্দ্বে হুয়াওয়ে যে আটকে যাবেনা তা নিশ্চিত করে বলার কোনো উপায় নেই।

তবে নতুন যুগের নতুনত্বের এই ইতিহাসের সাথে, সামনের কয়েক বছরের মধ্যে হুয়াওয়ের সবকিছুর পরেও এইযে বাধা পেরিয়ে নতুন কিছু তৈরি করার দৃঢ়-প্রত্যয়, তা যদি বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে একটা ঝাঁকুনির সৃষ্টি করে, তবে তাতে আমি একটুও অবাক হবো না।

নাফি আহমেদ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

হারমনি ওএস

এমন সব খবরাখবর পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন

জ্বিভাইডটকম

www.Jibhai.com

Leave a Comment