যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পার্থক্য

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পার্থক্য

ভূমিকাঃ আন্তর্জাতিক রাজনীতি অথবা অর্থনৈতিক পরাশক্তি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দেশ দুটি সবসময় আলোচনায় থাকে। বিশ্ব মোড়ল হিসেবে যেসব দেশকে কল্পনা করা হয় তার মধ্যে এই দুটি দেশ অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রকে ইংরেজিতে আমেরিকা এবং যুক্তরাজ্যকে ইংল্যান্ড নামে ডাকা হয়। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন আমেরিকা কে কেনো বাংলায় যুক্ত রাষ্ট্র বলা হয়? ইংল্যান্ড কে কেনই বা ডাকা হয় যুক্তরাজ্য হিসেবে? এ নিয়ে আমাদের যথেষ্ট কৌতুহল রয়েছে। আজকে আমরা আলোচনা করবো এই বিষয় নিয়ে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য নাম দুটি কিভাবে হলো। যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে পার্থক্যই বা কি। চলুন জেনে নেয়া যাক।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পার্থক্য কি, তা জানতে হলে আগে পৃথকভাবে দেশ দুটি সম্পর্কে ধারণা নেয়া প্রয়োজন। চলুন সংক্ষিপ্তভাবে দেশ দুটি পূর্ব ইতিহাস জেনে নেই।

যুক্তরাষ্ট্র বলতে যা বোঝায়

যুক্তরাষ্ট্র টাইমস্কোয়ার
টাইমস্কোয়ার, যুক্তরাষ্ট্র

United States Of America বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে রয়েছে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র। এই দেশটি একটি ভৌগলিক পরিসীমায় গঠিত দেশ নয়। এর রয়েছে সুবিশাল ও বিস্তৃত অঞ্চল ও অঙ্গরাজ্য। আমেরিকাতে রয়েছে প্রায় পঞ্চাশটি ছোট-বড় অঙ্গরাজ্য। দেশটিতে সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র চর্চা করা হয়। পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্য ছাড়াও পাচটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় জেলা নিয়ে আমেরিকা গঠিত। 

আমেরিকা মূলত উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত। দেশটি রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিসহ মোট আটচল্লিশটি রাজ্য নিয়ে প্রশান্ত এবং পূর্ব আটলান্টিক মহাসাগরের মাধ্যস্থলে অবস্থিত।

আমেরিকাকে যুক্তরাষ্ট্র বলে ডাকা হয় কেনো এ নিয়ে জনশ্রুতি আছে। তবে ইতিহাস ঘেটে যা জানা যায় তা হচ্ছে, 

ব্রিটিশরা আমেরিকায় যে স্থানগুলোতে উপনিবেশ স্থাপিন করেছিলো তখন মোট ১৩ কলোনি আকারে ছিলো। পরবর্তীতে স্বাধীনতা লাভের পর এই ১৩ টি কলোটি একত্রিত হয়ে একটি দেশ গঠন করেছিলো। তাই আমেরিকাকে যুক্তরাষ্ট্র বলা হয়ে থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে আরও ৩৭ টি প্রদেশ আমেরিকার সাথে যুক্ত হয়ে যায়। যদি আমেরিকার পতাকার দিকে ভালোভাবে তাকান তাহলে দেখতে পাবেন যে, তাদের পতাকায় ১৩ টি তারকা চিহ্ন রয়েছে। ১৩ টি প্রথম কলোনির জন্য পতাকায় মুলত ১৩ টি তারা ব্যাবহার করা হয়৷ 

আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী তাদের দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রীয় বা ফেডারেল। অর্থাৎ একটি কল্যাব বা সংঘে যেমন অনেক সদস্য থাকে কিন্তু তারা একত্র হয়ে একটি কাজ করে। তেমনি আমেরিকায় যে ৫০ টি রাজ্য রয়েছে সেসব রাষ্ট্রকে এক একটি দেশ হিসেবে কল্পনা করা হয় হয় সকল রাজ্য (দেশ) একত্রিত হয়ে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র গঠন করেছে যার নাম যুক্তরাষ্ট্র। তাই আমেরিকার অনেক রাজ্য তাদের অনেক বিষয়েই স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ভোগ করে থাকে৷ 

যেহেতু দেশটি একটি ফেডারেল সংবিধানতন্ত্র মেনে চলা হয় তাই পুরো দেশে বিভিন্ন রাজ্যে প্রাদেশিক আইন কেমন হবে, কোনো রাজ্যের উপর কেন্দ্রে নাকি রাজ্য আইন প্রনয়ণ করবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নিতীমালা আছে। দেশটিতে ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় আইন বলবৎ আছে।

মজার বিষয় হচ্ছে আমেরিকার নাগরিকদের দুটি নাগরিকত্ব থাকে! একটি হচ্ছে আমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্রের এবং অপরটি হচ্ছে তার নিজ রাজ্যের। এসব কারণে আমেরিকার আরেক নাম যুক্তরাষ্ট্র।

আশা করি এই আলোচনা থেকে আমেরিকাকে যুক্তরাষ্ট্র বলার কারণ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।

যুক্তরাজ্য বলতে যা বোঝায়

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশ হচ্ছে ইংল্যান্ড বা যুক্তরাজ্য। ইংল্যান্ড হচ্ছে আমেরিকার অন্যতম মিত্র দেশ। এখন চলুন জেনে নেই ইংল্যান্ড বা যুক্তরাজ্য সম্পর্কে। 

ল্যান্ডমার্ক, লন্ডন
ল্যান্ডমার্ক, লন্ডন

ইংরেজিতে দেশটি United Kingdom নামে পরিচিত। এছাড়া দেশটিকে যুক্তরাজ্য নামেও ডাকা হয়। যুক্তরাজ্য অবস্থান করছে ইউরোপ মহাদেশে অর্থাৎ ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের উত্তর-পশ্চিম উপকূলের কাছে। যুক্তরাজ্যের একটি সরকারি নাম রয়েছে। সেটি হচ্ছে, ‘দ্যা ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন এন্ড নর্থার্ন আয়ারল্যান্ড’। যুক্তরাজ্যও কিন্তু শুধুমাত্র একটি অখন্ড রাষ্ট্র নয়। দেশটিতে রয়েছে মোট চারটি সাংবিধানিক রাষ্ট্র। এগুলো হচ্ছে, ইংল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড, ওয়েলস এবং স্কটল্যান্ড। 

এটি একটি দ্বীপরাষ্ট্র। অনেকগুলো দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত বলে একত্রে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ নামেও পরিচিত। গ্রেট ব্রিটেন হচ্ছে এই দ্বীপ গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দ্বীপ। দক্ষিণ ও পূর্ব অংশ গঠিত হয়েছে যে বড় একটি দ্বীপের সমন্বয়ে তার নাম হচ্ছে ইংল্যান্ড। এই দ্বীপটি শুধুমাত্র আয়তনেই বড় নয় বরং জনবহুলও বটে। উত্তর দিকে স্কটল্যান্ড এবং পূর্ব অংশে রয়েছে ওয়েলস৷ 

আর যুক্তরাজ্য অধিকৃত উত্তর আয়ারল্যান্ড হচ্ছে মূল আয়ারল্যান্ড দ্বীপ থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে৷ ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় দ্বীপটি হচ্ছে আয়ারল্যান্ড। সিংহভাগ জুড়ে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সাথে যুক্তরাজ্যের একমাত্র স্থল সীমান্ত রয়েছে৷ এছাড়া আইরিশ সাগর, ইংলিশ চ্যানেল এবং আটলান্টিক মহাসাগর যুক্তরাজ্যের বাকি অংশ জুড়ে ঘিরে ধরে রেখেছে। ফ্রান্সের সাথে চ্যানেল টানেলের সাথেও যুক্ত রয়েছে গ্রেট ব্রিটেন। তাছাড়া ব্রিটিশ উপনিবেশিক যুগে তাদের হস্তগত প্রায় ১৪ টি অঞ্চল যুক্তরাজ্যের সাথে আছে। 

ব্রিটেনে সংসদীয় গনতন্ত্র ব্যাবস্থা কায়েম আছে। দেশটিতে এখনও রাজতন্ত্র সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত আছে। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তে রাজধানী লন্ডন অবস্থিত। 

ব্রিটেন নামেও আবার পুরো যুক্তরাজ্যকে ডাকা হয়ে থাকে। কিন্তু গ্রেট ব্রিটেন দ্বারা পুরো দেশকে না বুঝিয়ে শুধুমাত্র ঐ দ্বীপটিকে বোঝানো হয়৷ আবার আমরা ইংল্যান্ড বলে দেশকে বুঝে থাকলেও তারা শুধুমাত্র দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বড় দ্বীপটিকে বোঝায়। কিন্তু ওয়েলস, ইংল্যান্ড কিংবা স্কটল্যান্ডের অধিবাসীরা সবাই ব্রিটিশ নামে পরিচিত। তাদের আবার আলাদা পরিচয় রয়েছে, যেমনঃ ওয়েলসে যারা বসবাস করেন তারা ওয়েলশ, যুক্তরাজ্য শাসিত আয়ারল্যান্ড অধিবাসীরা আইরিশ এবং স্কটল্যান্ডে যারা বাস করেন তারা স্কটিশ নামে পরিচিত।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পার্থক্য

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দুটি আলাদা দেশ। তাই দেশ দুটির মধ্যে যথেষ্ট রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সংস্কৃতিগত পার্থক্য রয়েছে৷ নিচে এই দেশ দুটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও তুলনামূলক আলোচনা করা হলো।

  • সংক্ষেপে বলতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র অর্থাৎ এই দেশটি অনেক গুলো অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত, যাদের আলাদা স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন পদ্ধতি চালু আছে। অর্থাৎ কয়েকটি দেশ যদি একত্রে থাকতে চায় তাহলে তাদের মধ্যে যেরকম আইন-প্রণালী ও নিতীমালা থাকা প্রয়োজন তেমন আইন বা শাসন বিদ্যমান। তাই দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্র বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্র উত্তর আমেরিকা মহাদেশে অবস্থিত। 
  • অন্যদিকে ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্য হচ্ছে গ্রেট ব্রিটেন, ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলশ, স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত অনেক দ্বীপের সমষ্টি। ইউরোপ মহাদেশে দেশটির অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে যুক্তরাজ্য দেশটি আয়তনে ছোট।
  • যুক্তরাষ্ট্র একটি সাংবিধানিক প্রজাতিন্ত্রের দেশ এবং যুক্তরাজ্যে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের পাশাপাশি সংসদীয় গনতন্ত্রও রয়েছে। 
  • যুক্তরাষ্ট্র মিশ্র ও পুজিবাদী অর্থনিতীর দেশ। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে বাজার অর্থনিতী বিদ্যমান। 
  • যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ভাষা ইংরেজি হলেও ব্যাবহারগত সিক থেকে পার্থক্য রয়েছে। 
  • যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারে গণনা করা হয় কিন্তু যুক্তরাজ্যের মুদ্রা হয় পাউন্ডে।
  • যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য প্রতিবেশী দেশ হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়। কিন্তু যুক্তিরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য।
  • যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট শাসিত দেশ হলেও যুক্তরাজ্য মুলত মন্ত্রীসভা বা প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন প্রধান নেতা। 
  • যুক্তরাষ্ট্রে পৃথক পৃথক স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য রয়েছে। এসব রাজ্যের নাগরিকত্বের পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় সিটিজেনশিপ রয়েছে এদেশের নাগরিকদের। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের অধিকৃত অঞ্চলগুলো যেমন, ওয়েলশ, উত্তর আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড নিয়ে গঠিত সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সাথে সংসদীয় গনতন্ত্র চালু আছে।
  • যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে পঞ্চাশটি রাজ্য এবং একটি শাসনের আসন বা যাকে বলা হয় ফেডারেল জেলা। কিন্তু যুক্তরাজ্য হচ্ছে চারটি পৃথক রাষ্ট্রের সমষ্টি। 
  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেখতে ও আকারে অনেকটা একটি মহাদেশের অনুরূপ এবং অধিকাংশ জনগণ বাস করেন উত্তর আমেরিকায়। কিন্তু যুক্তরাজ্য অনেকগুলো ছোট ও বড় দ্বীপের সমষ্টি। একত্রে এগুলোকে দ্বীপপুঞ্জ বলা হয়ে থাকে।

পরিশেষে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য দুটি ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের সমষ্টি। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে নামের যেমন পার্থক্য রয়েছে তেমনি দেশ দুটির বিভিন্ন রাজ্য কিংবা আঞ্চলিক বৈচিত্রও রয়েছে। আশা করি আজকের আলোচনা থেকে বুঝতে পেরেছেন আমেরিকা কে যুক্তরাষ্ট্র বলা হয় কেন এবং ইউনাইটেড কিংডম কেই বা যুক্তরাজ্য বলা হয় কেনো।

রাশিয়ান সুখোই এসইউ-৫৭ কি পারবে পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটারের সকল গুন অর্জন করে বিশ্বের সেরা ফাইটার হতে! পড়ুন রাশিয়ান সুখোই এসইউ-৫৭

Mehedi Hasan

আমি মেহেদী হাসান শাওন। পড়াশোনা করছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখালিখি করা আমার প্রিয় শখ।

এই পোস্ট শেয়ার করুন

1 thought on “যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পার্থক্য”

Leave a Comment