মধ্যাহ্ন উপন্যাস হুমায়ুন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন হুমায়ূন আহমেদের একটি বই। যেটি ২০০৭ সালের বইমেলায় অন্যধারা প্রকাশনীর মাধ্যেমে প্রকাশিত হয়।

বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৩৯। 

মধ্যাহ্ন উপন্যাসের পটভূমি

মধ্যাহ্ন ১৯০৫ সালের পটভূমিতে লেখা উপন্যাস। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর চমৎকার লেখনীতে বিভিন্ন উল্লেখ যোগ্য ঘটনা তুলে ধরছেন। কিশোর নজরুলের হোটেলে রুটি বানাতে বানাতে গান লেখা থেকে শুরু। এরপরে বঙ্গভঙ্গে হিন্দুদের ভূমিকা পর্যন্ত অনেক ঘটনা তুলে ধরেছেম এই বইয়ে। আমাদের এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে হিন্দুদের বিরোধীতার ঘটনাকে অনেক গোঁয়ার গবিন্দের মত চোখ কান বন্ধ করে অস্বীকার করেননি। যেটা অনেক ভাল লেগেছে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধীদের আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। যে কথা এড়িয়ে গিয়েছেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যে রাখি বন্ধনের প্রচলন করা হয়েছিলো, সেটার বিষয়েও দেয়া তথ্যটা নিয়ে একটু সন্দেহ লাগছে।

এই রাখি ব্যাপারটা নিয়ে আমিও একটু অনিশ্চিত। তাই সঠিক বলতে পারছি না। 

মধ্যাহ্ন উপন্যাসে তৎকালীন মুসলিম সমাজের উপরে হিন্দু সমাজের নির্মম অত্যাচারের কিছু কিছু চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। যেটা অনেক ভাল লেগেছে। হিন্দুরা মুসলমানদের খুব নিকৃষ্ট মনে করতো তখনকার সময়ে। মুসলমানরা তাদের দৃষ্টিতে ছিলো ‘অস্পৃশ্য’। আমার মা’য়ের মুখে এধরনের বেশ কিছু গল্প শুনেছিলাম। 

যেমন কোন ঘাট থেকে হিন্দুরা কলসি ভরে পানি নিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় কোন মুসলমান যদি ভুলেও ঐ পানির কোথাও স্পর্শ করতো তাহলে তারা সব পানি ফেলে দিয়ে নতুন করে পানি ভরে নিতো। বই থেকে একটা লাইন নিতে পারি- “তিনি এক মুসলমান কাঠমিস্ত্রির ছেলে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন- এ দৃশ্য হাস্যকর। যবনপুত্র অস্পৃশ্য হওয়ার কথা। ব্রাক্ষণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। শূদ্রের নিচে যবনের অবস্থান। ” 

মধ্যাহ্ন উপন্যাসের চরিত্র

উপন্যাসের এক চরিত্রের নাম ‘হরিচরণ’। এটা ছিল মুসলিম কাঠমিস্ত্রির ছেলে ‘জহির’কে কোলে নেয়ার বিষয়ক ভাবনাটা। মুসলিম কাঠমিস্ত্রির ছেলের জীবন বাঁচানো এবং নিজের ঘরে প্রবেশ করানোর অপরাধে হরিচরণকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিলো। 

বিধান অনুযায়ী যবনপুত্রকে কোলে নেয়া এবং তাকে ঘরে নেয়া নিষিদ্ধ ছিম। যেটা ধর্ম থেকে পতিত হওয়ার সমান অপরাধ। যে অপরাধের শাস্তি ভয়াবহ। যার জন্য নরকের নিন্ম স্থানে জায়গা হবে।

এগুলো যদি তাদের বিধানে লেখা থাকে তাহলে বিষয়টা নিয়ে আমার মতভেদ আছে। কলেজ লাইফে আমার হিন্দু বন্ধু ছিল। যে আমার সাথে একরুমে থাকতো। 

তার বাড়ি গিয়ে আমি খেয়েছি সে আমার বাড়ি এসে খেয়েছে। দুজন এক থালায় ভাত ভাগাভাগি করেও খেয়েছি।

বিধান মতে ওই বন্ধুর জাত যাওয়ার কথা ছিল। তার পরিবারকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করার কথা ছিল। কিন্তু তেমন কিছু হয়নি। তবে কি তারা বিধান মানে না!

ভারতের হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে কি হিন্দুরা এগুলো এখনো মেনে চলে? তবে সেখানের মুসলমানদেরও কি সেই ১৯০৫ সালের মত পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে? 

উপন্যাসের কাহিনী

উপন্যাসে তৎকালীন মুসলিম সমাজের কিছু অন্ধত্বও বেশ চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে এখানে একটা বিষয়ে খুব সরলীকরণ করে ফেলেছেন। কিছু সুবিধাবাদী মুসলিম চরিত্র যারা না বুঝে দাসীদের সাথে অবৈধ সম্পর্ককে সঠিক মনে করে উলটা-পালটা কাজ কর্ম করে বেড়াতো তাদের রেফারেন্স দিয়ে পুরো বিষয়টা মুসলিম সমাজের উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন। 

এধরনের সরলীকরণ দু:খজনক! তবে কিছু অন্ধত্ব খুব ভয়াভয় ছিলো। যা এখন নেই বলা চলে। ওগুলো ছিলো মূলত ধর্ম সম্পর্কে কম জানার ফল। মুসলিম সমাজের নামে এপর্যন্ত যত অপবাদ এসেছে তার বেশীর ভাগই এইসবআধা ধার্মিকদের কারণে হয়েছে। আমাদের মুসলমানদেরই উচিত এসব আধাধার্মিকদের সঠিক ধর্ম শিক্ষা দিয়ে এদের অন্ধত্ব দূর করা। 

মধ্যাহ্ন উপন্যাসে ‘ধনু শেখ’ নামে নাম মাত্র মুসলিম এক ধূর্ত চরিত্র রয়েছে যার একটা ধূর্তামির শিকার হয়ে ‘অম্বিকা ভট্টাচার্য’ নামের এক হিন্দু ঠাকুর কে গো-মাংস ভক্ষন করতে হয়েছিলো।

সাধারন বিধান মতে এটা মহাপাত। তবুও বিধানের ফাঁক ফোকর গলে ঠাকুরকে রক্ষার চেষ্টা করা হলো, কিন্তু কাজ হলো না। সমাজচ্যুত হয়ে ঠাকুর পরিবার অবশেষে মুসলিম হওয়ার সিন্ধান্ত নিলেন।

অনিচ্ছাস্বত্বেও হিন্দু ধর্মের একজন সম্মানীত ঠাকুরকে এভাবে মুসলিম বানানো কেমন যেন হয়ে গেল। যদিও অম্বিকা ভট্টাচার্যের প্রতি এই আচরণ করার পেছনে ধনু শেখের কিছু ভূমিকা রয়েছে।

উপন্যাসের চরিত্র হরিচরণ ছিলো ধনু শেখের প্রিয় একজন। এই হরিচরণকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করার বিষয়টি নিয়ে হরিচরণ একদা জাত বিষয়ক কিছু প্রশ্ন তুলেছিলো, যা হিন্দু সমাজের অপছন্দের কারণ হওয়া ধনু শেখের চাকুরী চলে যায় এবং গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে পথে বসতে হয়। 

হরিচরণকে সমাজচ্যুত করার পেছনে অম্বিকা ভট্টাচার্যের বিশেষ ভূমিকা থাকার কারণেই ধনু শেখ এই হঠকারিতার আশ্রয় নিয়েছিলো। আমি এটাকে প্রতিশোধ ভেবে নিয়েছি। এ উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রের মত অম্বিকা ভট্টাচার্যও শুধু উপন্যাসের একটি চরিত্র নয়। 

‘অম্বিকা ভট্টাচার্য’ একজন বাস্তবের মানুষ। তাঁর পরিবারের সদস্যরা এখনো আমাদের দেশে বাস করছে। ‘ধনু শেখের’ হঠকারিতায় মুসলিমদের উপর এই পরিবারের আজন্ম আক্রোশ থাকার কথা। আমার মনে হয় তেমনটিই রয়েছে। অম্বিকা ভট্টাচার্যের এক বংশধর আমাদের দেশে বেশ পরিচিত একটি ফ্যামিলি। সেই ফ্যামিলির এক সদস্য যদি চরম মুসলিম বিদ্বেষী হয়, তাহলে সম্ভবত এরজন্য তাঁকে খুব বেশী দোষ দেয়া যায় না।

বইটি পড়ার ইচ্ছাবোধ করেলে রকমারিডটকমে মাত্র ৫১০ টাকায় কিনতে পারবেন।

ধন্যবাদ

Jubaer Hasan Rabby

University Of Chittagong

আরো বই রিভিউ পড়ুন

বাদশাহ নামদার বই রিভিউ

গাভী বিত্তান্ত আহমেদ ছফা

দূরবীন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

Leave a Comment