বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ড। বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাস পার্ট-১

By Sourav Das

বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাস

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন গায়ক  তার গানের মাধ্যমে সৈনিকদের উজ্জীবিত রাখতেন। তিনি আর কেউ নয় তিনি আমাদের পপ তারকা আজম খান। তার পুরো নাম মাহবুবুল হক আজম। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মূলত তার হাত ধরেই গড়ে উঠে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত। এই কারনেই সকলের কাছে তিনি গুরু নামে পরিচিত। 

৮০’র দশক থেকে বাংলাদেশে ব্যান্ড মিউজিকের শুরু বলা যায়। বর্তমানে আমাদের দেশের অন্যতম একটি জনপ্রিয় একটি বিষয় হল ব্যান্ড সংগীত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ নিয়ে গর্ব করার মত একটি বিষয় এই ব্যান্ড মিউজিক। নানান উথ্যান-পতনের মধ্য দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের ব্যান্ড গুলো সেই ৮০ দশক থেকে। তবুও এক হার না মানা শিকারি বাঘের মত ছুটে চলেছে প্রতিনিয়ত।পুরাতন ব্যান্ড গুলোকে আদর্শ মেন গড়ে উঠেছে অনেক ব্যান্ড দল।

বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ড

উচ্চারণ ব্যান্ড

বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ড
আজম খান

বাংলা পপগুরু, পপ সম্রাট

১৯৭১ সালে রাজধানী শহর ঢাকাতে গুরু আজম খান ও তার কিছু বন্ধু মিলে একটি ব্যান্ড দল গড়ে তুলে যা উচ্চারণ ব্যান্ড নামে পরিচিত। এই ব্যান্ডের লাইনআপে গিটারিষ্ট ছিল আজম খানের বন্ধু নিলু ও মনসুর, ড্রামে ছিল তার বন্ধু সাদেক ও গায়ক হিসাবে ছিলেন তিনি নিজে।

১৯৭২ সালে তারা সর্বপ্রথম বিটিভিতে প্রগ্রাম করে। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারনে আস্তে আস্তে তাদের প্রগ্রামের পরিমান কমে আসে। রেললাইনের ওই বস্তিতে, আলাল ও দুলাল, আমি যারে চাই রে, দায়রা জজের আদালতে,আসি আসি বলে তুমি আর এলে না, আভিমানী, অনামিকা সহ আরো অনেক হিট গান ছিল তাদের। দীর্ঘ দিন ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে ৫ জুন, ২০১১ সালে তিনি ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যু বরণ করেন। ২০১৯ সালে তিনি সংগীত বিভাগে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। চলে যেয়েও তিনি ভক্তদের মনের মধ্যে রয়েছেন। 

প্রমিথিউজ

বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ড
প্রমিথিউজ ব্যান্ড

গ্রিক দেবতা “প্রমিথিউজের” নামের উপর ভিত্তি করে ১৯৮৬ সালে গড়ে উঠে এই ব্যান্ড দল। ৮০ দশকের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড প্রমিথিউজ। তাদের লাইনাআপে ভোকাল ও গিটারিস্ট  হিসাবে বিপ্লব, কিবোর্ডে বিপ্লব, লীড গিটারে  সোহাগ, ড্রামে সৈকত ও ডিজেতে রুবেল ছিলেন। তাদের মোট ১৮ টি এলবাম রয়েছে। তাদের গানগুলো ছিল মূলত সমাজের সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যাকে কেন্দ্র করে। প্রতিবারই তারা দর্শকদের ভিন্ন ধাঁচের গান উপহার দিয়েছে।

এল.আর.বি.

বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ড নাম
আইয়ুব বাচ্চু

এল.আর.বি. (LRB) শব্দের পূর্ণরূপ লাভ রানস ব্লাইন্ড (Love Runs Blind). চট্রগ্রামে ৫ এপ্রিল ১৯৯০ সালে প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চু গঠন করেন এই ব্যান্ড দল। তখন লাইনআপে ভোকাল ও লীড গিটারে ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু, বেস গিটারে সাইদুল হাসান স্বপন, গিটারে আবদুল্লাহ আল মাসুদ, ড্রামে গোলামুর রহমান রোমেল, কিবোর্ডে এস আই টুটুল। কিছু সমস্যার কারনে এস আই টুটুল LRB ত্যাগ করেন এবং LRB পরবর্তী সময়ে কিবোর্ড ছাড়ায় নিজেদের কার্যক্রম চালু রাখে। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকায় আইয়ুব বাচ্চু মারা যায়। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যু সংঙ্গীত অঙ্গনে এই বিশাল শোকের ছায়া নিয়ে আসে। কারন এই মানুষটা একজন সফল গায়ক বা লীড গিটারিস্ট থেকে অনেক বেশি কিছু ছিলেন। তার হাত ধরে হাজার হাজার তরুন ব্যান্ড মিউজিকে প্রবেশ করেছে। LRB ব্লজ রক, সাইকেডেলিক রক, হার্ড রক ধাঁচের গান করত। মূলত তাদের গানের লিরিক্সগুলো ছিল মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে, যা শ্রতাদের গভীর ভাবে আকৃষ্ট করত। তাদের ১৩ টি স্টুডিও এলবাম, অনেক গুলো মিশ্র এলবাম, ২ টি সংকলিত এলবাম ও ১ টি লাইভ এলবাম আছে। তারা ৬ টি মেরিল আলো পুরষ্কার পেয়েছেন। 

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর LRB এর গায়ক হিসাবে যোগদান  করেন বালাম জাহাঙ্গীর। পরবর্তীতে  বাচ্চু পরিবারের অনুরোধে LRB সদস্যরা তাদের নাম পরিবর্তন করে Balam & The legacy করেন।

মাইলস

বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ড
মাইলস

১৯৭৯ সালে মাইলস ব্যান্ড দল গড়ে উঠেছে। প্রথমে তারা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাজাত পরে ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সোঁনারগাও প্যান প্যাসিফিক হোটেলে বাজিয়েছেন। তারপর তারা তাদের প্রথম এলবাম বের করে এবং প্রথম এলবামেই তারা হিট হয়ে যায় আর এর পর থেকেই শুরু হয় ব্যান্ড মাইলস এর যাত্রা। ব্যান্ডটিতে বেজ গিটারিস্ট ও ভোকাল হিসাবে আছেন শাফিন আহমেদ, গিটার ও কন্ঠে আছেন হামিন আহমেদ, কিবোর্ডে মানাম আহমেদ, ইকবাল আসিফ জুয়েল রয়েছেন গিটারে আর ড্রামে আছেন সৈয়দ জিয়াউর রহমান তূর্জ। তাদের মোট ৮ টি স্টুডিও এলবাম রয়েছে। মাইলস পিংক ফ্লয়ে, দ্যা বিটলস, ডিপ পার্পল দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত ছিল। তাদের গানের মাধ্যে দিয়ে বাংলা ব্যান্ড সংগীতে এক নতুন ধারার সূচনা হয়। তারা একাধারে রক, ব্লুস, জ্যাজ, লাটিন মিউজিক করত। চাঁদ তারা সূর্য, ধ্বিকি ধ্বিকি, ফিরিয়ে দাও, জ্বালা জ্বালা, পাহাড়ী মেয়ে, স্বপ্নভঙ্গ, ভুলবোনা তোমাকে, নিরবে কিছুক্ষণ, প্রিয়তমা মেঘ, নীলা সহ আরো অনেক অনেক জনপ্রিয় গান রয়েছে তাদের ঝুলিতে। 

ফিলিংস থেকে নগর বাউল

বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ড দল
জেমস

৭০ দশকে ফিলিংস ব্যান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন ফিলিংস ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন মঙু, কলুর, র‍্যালি ও রুডি থমাস। পরবর্তীতে যোগ দেন ফারুক মাহাফুজ আনাম। যিনি সবার কাছে জেমস নামে পরিচিত, আবার ভক্তরা তাকে ভালবেসে গুরু নামেও ডাকে। আইয়ুব বাচ্চু, কুমার বিশ্বজিতের মত নামকরা মিউজিসিয়ান ছিলেন এক সময় ফিলিংস ব্যান্ডে। কিন্তু তারা ফিলিংস ত্যাগ করেন এবং তখন ফিলিংস এর হাল ধরেন গুরু জেমস ও এহসান এলাহী ফান্টি। পরবর্তীতে বেজিস্ট হিসাবে যোগদেন স্বপন ও কিবোর্ডে পাবলো। ১৯৮৭ সালে ফিলিংস বের করে তাদের প্রথম এলবাম “স্টেশন রোড”। এরপর বেজিস্ট স্বপন আইয়ুব বাচ্চুর সাথে কাজ করা শুরু করে এবং ফিলিংস ত্যাগ করে। তারপর ফিলিংসে বেজিস্ট হিসাবে যোগদান করেন বাংলা ব্যান্ড মিউজিকের আরে নক্ষত্র বেসবাবা সুমন। তিনি ফিলংসের সাথে কোন স্টুডিও এলবাম না করলেও অনেক কন্সার্ট করেন। ১৯৯৩ সালে ফিনিংস তাদের ২য় এলবাম “ জেল থেকে বলছি প্রকাশ করে। এর এলবামের মধ্য দিয়ে তারা হার্ড রক মিউজিকে প্রবেশ করে। ১৯৯৫ সালে রিলিজ হয় “ পালাবে কোথায়” ও ১৯৯৬ সালে রিলিজ হয় “নগর বাউল”। ফিলিংস ব্যান্ডের শেষ এলবাম ছিল “লেইস ফিতা লেইস”। তারপর জেমস ফিলিংস নাম পরিবর্তন করে তাদের তৃতীয় এলবামের নামে ব্যান্ডের নাম দেয় “নগর বাউল”। নগর বাউল মাএ একটি এলবাম প্রকাশ করে। তারপর জেমস নিজের সলো ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। ব্যান্ডটির বর্তমান লাইন আপ ভোকাল ও লীড গিটারে জেমস, ড্রামে ফান্টি, রিদম গিটারে রানা, বেস গিটারে সাব্বির, কিবোর্ডে তমাল।

আর্ক

বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ড দল
হাসান

বাংলাদেশের অন্যতম এক জনপ্রিয় ব্যান্ড আর্ক। আশিকুজ্জামান টুলু এই ব্যান্ডটি গঠন করেন। পরবর্তীতে গায়ক হিসাবে যোগ দেন হাসান। বাংলা ব্যান্ড মিউজিককে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে আর্কের অবদান অনস্বীকার্য। ২০০২ সালে হাসান ব্যান্ডটি ছেড়ে দিলে ব্যান্ডের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় ও ব্যান্ডের প্রতিষ্টাতা আতিকুজ্জামান টুলু পাড়ি জমান কানাডা। হাসান ২০১০ সালে ঘোষনা দেন যে তিনি আবার আর্কে ফিরে আসবেন। তখন থেকে ব্যান্ডটি আবার নিয়মিত হয়। আর্কের সংগ্রহে রয়েছে মোট ৫ টি এলবাম। ২০০২ সালে তাদের সর্বশেষ এলবাম “হারানো মাঝি”। আর কোন এলবাম প্রকাশ না পেলেও এখনো নিয়মিত আর্ককে স্টেজে দেখা যায়। সুইটি তুমি আর কেঁদো না, এত কষ্ট কেনো ভালবাসায়, যারে যা উড়ে যা, আজ এই এই মেঘে ঢাকা রাত সহ আরো অনেক হিটগান আছে আর্কের।

নোভা (বাংলাদেশের ব্যান্ড)

 সেরা ব্যান্ড
নোভা

১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যান্ড নোভা। ব্যান্ডটি প্রতিষ্ঠা করেন আহমেদ ফজল করিম। নোভার মোট ৭ টি এলবাম রয়েছে। তাদের প্রথম এলবামের নাম আহবান। এই এলবামের আহবান গানের মাধ্যমে তারা সমাজকে মাদক বিরোধী এক বার্তা দেয় যা তখন প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং তারা সরকারের কাছ থেকে বিশেষ পুরষ্কার পায়। তাদের দ্বিতীয় এলবামের নাম ছিল রাজাকারের তালিকা চায়। এই এলবামের মাধ্যমে তারাই সর্বপ্রথম রাজাকারের তালিকা চেয়ে চিৎকার করে। তাদের তৃতীয় এলবামের নাম ছিল স্কুল পলাতক মেয়ে। এই এলবামটি ছিল বাংলা ব্যান্ড মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিরর অন্যতম ব্যাবস্যা সফল এলবাম। ২০১০ সালে তারা নোভার প্রত্যাবর্তন নামে একটা এলবাম বের করে। 

ক্রিপটিক ফেইট

বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ডের নাম
ক্রিপটিক ফেইট

১৯৯০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠি হয় ক্রিপটিক ফেইট ব্যান্ড। ১৯৯৪ সালে তাদের প্রথম এলবাম এন্ডস আর ফরএভার বের হয়। এলবাম জুড়ে সব কয়টি গান ছিল ইংরেজি ভাষায়। ২০০১ সালে তাদের দ্বিতীয় এলবাম শ্রেষ্ঠ বের হয়। এই এলবামটি ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে৷ ২০০৬ সালে তাদের তৃতীয় এলবাম দানব বের হয়। আর এই এলবামটি ছিল আগের দুইটি এলবামের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের। যা শ্রতা শ্রেণীতে তাদের এক পাহাড়সম জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ব্যান্ডটির লাইনআপে ভোকাল ও বেজে ছিল সাকিব চৌধুরী, লীড গিটারে সরফারাজ, সাইড ফিটারে ফারহান এবং ড্রামে ছিল রায়েফ আল হাসান রাফা।

অবসকিওর (বাংলা ব্যান্ড)

জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড
অবসকিওর

১৯৮৫ সালে রুপশা নদীকে ঘিরে গড়ে উঠা খুলনা শহরে সাইদ হাসান টিপু অবসকিওর ব্যান্ড প্রতিষ্টা করে। তারা রক ও পপ ধরনের গান করত। অবসকিওর এর মোট ৯ টি স্টুডিও এলবাম রয়েছে। ৯০ দশকের মাঝামাঝিই অবসকিওর হারিয়ে যায়৷ আবার ২০০৭ সাল থেকে তাদের স্টেজে দেখা যায়।

সোলস

বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ড তালিকা
সোলস ব্যান্ড

স্বাধীনতার ঠিক পরে দেশের অবস্থা সকল দিক দিয়ে নাজেহাল ঠিক তখন চট্রগ্রামের কিহু গান পাগল তরুন জিলু, রনি বরুয়া, নেওয়াজ, তাজুল, সাজিদ একত্রে। মিউজিক করার কথা চিন্তা করেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মিউজিশিয়ান সোলসের সাথে কাজ করেছেন। ৮০ দশককে সোলসের স্বর্ণযুগ বলে হয়। শ্রতাদের কাছে সোসলের তখনকার লাইনআপ ছিল সব থেকে সেরা। তখনকার লাইন আপে ছিল তপন চৌধুরী, আইযুব বাচ্চু, রনি বড়ুয়া, নকীব খান, পিলু খান, নাসিম আলী খান, সাজেদ, নেওয়াজ। সোলসের বর্তমান লাইনআপে লীড গিটার ও ভোকাল পার্থ বড়ুয়া, বেজ গিটারে জাকের হাসান রানা, সাইডভোকালে নকীব আলী খান, কীবোর্ডে মীর শারিয়ার হোসেন মাসুম, ড্রামে এস.কে আনিসুর রহমান আশিক আছেন। কেন এই নিসঃঙ্গতা, আমি আর ভাবনা, মন শুধু মন ছুয়েছে, কলেজের করিডোরে, তুমি আজ বিকালে সহ আরো অনেক জনপ্রিয় গান রয়েছে তাদের।

আরো পড়ুন

বাংলা ব্যান্ড সংগীতের একাল সেকাল

Leave a Comment