ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের স্থপতির আত্মত্যাগ ও বর্তমান প্রজন্ম

 

    দেয়াল ঘড়িটা  ঢং ঢং  শব্দ করে জানিয়ে দিল যে ,এখন সময় রাত বারোটা ।ঘড়ির কাঁটার সাথে ক্যালেন্ডারের পাতায়ও যে পরিবর্তন হয়ে গেল সেটাও আন্দাজ করতে হলো না।কারণ, গতকাল ছিল জুলাই মাসের ৩১ তারিখ ।তাই ইংরেজি তারিখ সূত্রে এবার রাত বারোটা পেরনোর সাথে সাথে শুরু হলো আগস্ট মাস।

স্টাডি চেয়ার থেকে উঠে রুমে টাঙানো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাস্যরত একটা হাতে আকা ছবির কাছে গিয়ে দাড়ালাম।মনের গভীরে যে কল্পনার চোখ আছে ।তা দিয়ে ছবির মধ্যেকার সেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির এই দেশ ,এই জাতির জন্মের পেছনে যে অবদান তা স্পষ্ট চোখে পড়লো ।

এক দৃষ্টিতে যখন বঙ্গবন্ধুর ছবির দিকে চেয়ে আছি ঠিক সেই সময় আমার আট বছরের বিলেত ফেরত  নাতিটি যে কখন আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আমি সেটা খেয়ালই করি নি ।

অবশ্য যদি না নাতিটি আমার পেছনে এসে ডাক না দিতো তবে তো আমি খেয়ালি করতাম না যে বর্তমানে আমার বাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেহমান এই মাঝরাতে আমার স্টাডি রুমে এসে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে !

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “দাদু ভাই ! এখনতো অনেক রাত ।তুমি ঘুমাও নি কেন? বাংলাদেশে এসে কি লন্ডনের  সময় মেইনটেইন করে ঘুম আসছে না নাকি?”

প্রতি উত্তরে সে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিল এবং বলল, “দাদু ,লন্ডনে আমার একজন ন্যানি ছিল ।

সে ডেইলি রাতে আমাকে ফ্যারি-টেল শুনাতো ।আমি ওর ফ্যারি-টেইল শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতাম।কিন্তু এখানে তো ন্যানি নেই ।আমাকে কে ফ্যারি-টেইল শুনাবে ?তাই ঘুম আসছে না ।এজন্য তুমি কি করছো তাই দেখতে তোমার স্টাডি রুমে চলে এলাম ।”

আমি বললাম, “ও ,এই ব্যাপার।আচ্ছা আমি যদি একটা গল্প শুনাই তবে কি তুমি শুনবে ?”

“হ্যাঁ, অবশ্যই দাদু ।বাবা বলে তুমি নাকি অনেক ভালো গল্প জানো ।আমাকে শুনাও না একটা গল্প!”নাতিটি আমার গলা জড়িয়ে ধরে উক্ত আবদারটি করে বসলো।

আমি ওর এই ছোট্ট আবদারটা ফেলতে পারলাম না ।তাই ওকে আমার স্টাডি রুমের রাখা ছোট্ট ডিভানে শুয়ে দিয়ে গল্প বলতে রাজি হয়ে গেলাম ।

আমার গল্পের শ্রোতা আমার একটা হাত আলতো করে জড়িয়ে ধরে আমাকে গল্প বলতে ইঙ্গিত দিল।

আমি ও গল্প বলা শুরু করলাম ।

“পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহাপুরুষ এসেছিলেন ।

কেউ ছিলেন ধর্ম প্রবর্তক, কেউ ছিলেন বাদশা আবার কেউ ছিলেন অবিসংবাদিত নেতা ।এইযে আমাদের এই ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশ, এটা একসময় ব্রিটিশদের উপনিবেশ ছিল ।এরপর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের উপনিবেশ ছিল ।যখন ব্রিটিশদের উপনিবেশ ছিল ঠিক তখনই ১৯২০ সালে আমাদের এই ভূখণ্ডে আরো হাজার হাজার শিশুর মতো একটা সাধারণ ঘরে একটা সাধারণ শিশুর জন্ম নেয়।জন্মের পর শিশুটির বাবা মা নাম রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান ।তবে ডাক নাম ছিল ‘খোকা ‘।শিশুটি ছোটবেলা থেকেই নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সবসময় যেমন ছিল সচেতন ঠিক তেমনি তার মন ছিল দরিদ্র মানুষের জন্য তুলোর মতো নরম।ছোটবেলা থেকেই ‘খোকা’ তথা ছোট্ট মুজিব রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন ।আস্তে আস্তে যখন তিনি পরিপক্ব হতে থাকলেন তখন তার মধ্যে তত্কালীন বাঙালিদের ভরসা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব ভবিষ্যত নেতৃত্বের কান্ডারীকে খুঁজে পেলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের সহ -সম্পাদক পদে নিযুক্ত হবার মাধ্যমে ব্রিটিশ পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে পা রাখেন ।

এরপর থেকে তাঁকে কারাগারে যাওয়া আসার মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান এই বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত থাকতে হয় ।১৯৬৮ সালে যখন আইয়ুব খানের সামরিক সরকার শেখ মুজিবুর রহমান সহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেন তখনও তাঁকে কারাগারে থাকতে হয় ।কারাগারে কিন্তু তিনি বর্তমান যুগের রাজনৈতিক বন্দিদের মতো থাকতেন না ।

তাঁকে যতবারই বন্দি করা হতো ততোবারই তাঁর শাস্তিগত মৃত্যুর সম্ভাবনা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো ।

কিন্তু তিনি কখনো একমুহূর্তের জন্য বিচলিত হতেন না ।

তিনি সত্যের পক্ষে ছিলেন ।তিনি বাঙালির স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন ।বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন ।১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তান সরকার তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক তখন পাকিস্তানের কারাগারে বসে সৃষ্টিকর্তার কাছে তিনি আমাদের এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রার্থনা করতেন । 

১৯৭১ সালে আমাদের বিজয়ের পর,১৯৭২ সালে দেশে ফিরে যখন তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে গঠনের সংকল্প নেন তখনও কিন্তু তাঁর ত্যাগ শেষ হয়নি! তখন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে তার প্রাপ্য অধিকার পৌছে দেওয়া,প্রাপ্য সেবা পৌছে দেওয়া ।তিনি ১৯৭১  সালে যেমন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, ঠিক তেমনি ১৯৭২ সালে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দারিদ্র্য ,অশিক্ষা ,বেকারত্ব, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদির বিরুদ্ধে একযোগে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ।

দিন রাত এক করে তিনি ভাবতে থাকেন কি করে তাঁর এই স্বাধীন ভূখন্ড কে রূপকথার সেই সোনার বাংলায় রূপান্তর করা যায়

তিনি কিন্তু ভেবেও বের করেছিলেন এই রূপান্তরের উপায়! তিনি বাকশাল গঠনের মাধ্যমে দেশের দরিদ্র কৃষকদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন ।এছাড়াও স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য পদ লাভ এবং বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি লাভের জন্যও তাঁকে দৈনন্দিন জীবনের তথাকথিত শান্তি এমনকি অনেক গবেষকের মতে প্রাণ টাও দিতে হয় ।আজকের মুসলিম বিশ্বের মুকুট সৌদি আরব কিন্তু আমাদের এই দেশ কে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় নি ! উনাকে যখন একদল বিপথগামী সেনা সদস্য হত্যা করলো ঠিক তাঁর কয়েক দিনের মাথায় সৌদি আরব বাংলাদেশ কে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ।”

“আচ্ছা দাদু,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো ভালো মানুষ ছিলেন।ভালো লিডার ছিলেন।

ভালো প্রেসিডেন্ট ছিলেন ।কিন্তু তাহলে কিছু সেনা সদস্য তাঁকে মারলেন কেন? যারা মারলেন তারা কি আমাদের দেশের কেউ ছিল না?তারা কি বাঙালি ছিল না ?”—-আমার একনাগাড়ে অনেকক্ষণ কথা শোনার পর আমার নাতিটি আমাকে উক্ত প্রশ্ন গুলো ছুঁড়ে দিলো ।

আমি ওকে বল্লাম, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব এবং স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নতি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক অনেকেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিল না ।বঙ্গবন্ধু যে নীতিতে এই বাংলাদেশ কে পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন সেই নীতিটা ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে অনেকটা গলার কাটা হয়ে গেছিল ।আর এই গলার কাটার ব্যথা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ ছিল আমাদের বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা।আসলে ঐদিন শুধু যে উনি এবং উনার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়নি ,হত্যা করা হয়েছিল সম্ভাবনাময় একটি দেশের উন্নয়ন কে।”

আমার কথা শুনে ছোট্ট নাতিটি তার ছোট ছোট চোখ গুলো মুছলো

বঙ্গবন্ধুর জীবনের এই আত্মত্যাগ ওর শিশু মন কে ব্যথিত করেছে।সে চট করে উঠে গিয়ে একটা চেয়ার এনে তাতে উঠে দেয়ালে টাঙানো বঙ্গবন্ধুর ছবিটা নামিয়ে একটা চুমু খেল এবং বলল, “স্যার, আপনি গডের কাছে থেকে যে সবসময় আমাদের এই বাংলাদেশকে যে দেখছেন তা আমি জানি ।আপনি চিন্তা করবেন না স্যার ।আমি বড় হয়ে আপনার যে স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা গড়ার, সেটা পূরণ করবো ।আপনার কষ্ট গুলোকে বৃথা যেতে দিবো না ।”

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাতির এরকম কান্ড দেখে মুচকি হেসে মনে মনে বললাম, ” দেহ ছোট হোক কিংবা বড় ! সব বাঙালির মনেই কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজও অমর।” 


                   লেখক:সামিউল হক (নিঝুম)

I am the Admin Of Jibhai.com and also part of jibhai.com

Leave a Comment