ফাগুন হাওয়ায় ঐতিহাসিক নাট্যধর্মী চলচ্চিত্র; তৌকির আহমেদ

মুভি রিভিউ: ফাগুন হাওয়ায়– In Spring Breeze 

গল্প: টিটো রহমান 

অভিনয়ে: সিয়াম আহমেদ, নুসরাত ইমরোজ তিশা, যশপাল শর্মা (ভারত), সাজু খাদেম, আফরোজা বানু, রওনক হাসান, আবুল হায়াৎ, ফজলুর রহমান বাবু প্রমুখ।

পরিচালনায়: তৌকির আহমেদ 

ফাগুন হাওয়ায়

ব্যক্তিগত রেটিং: ৮/১০


মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে এদেশে অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। হাঙর নদী গ্রেনেড, আমার বন্ধু রাশেদ, গেরিলা, ওরা এগারো জন, আবার তোরা মানুষ হ তার যোগ্য উদাহরণ। এ ধরনের ইতিহাসনির্ভর চলচ্চিত্র আমাদের গৌরবময় অতীতকে যেমন নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে। পাশাপাশি ইতিহাস সম্পর্কে থাকা সমস্ত ভ্রান্ত ধারণারও অবসান ঘটিয়ে জাতি হিসেবে আমাদের করে সমৃদ্ধ। কিন্তু কাউকে যদি ভাষা আন্দোলন নিয়ে নির্মিত হয়েছে এরকম কোনো চলচ্চিত্রের নাম বলতে বলা হয়, তাহলে অধিকাংশ মানুষই থতমত খেয়ে যাবে। আর খাবে নাই-বা কেন, কেননা ভাষা আন্দোলনের উপর এদেশে নির্মিত হয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি চলচ্চিত্র।

এদেশের মানুষ ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জেনেছে বই পড়ে কিংবা তার বাবা-দাদা-নানার মুখ থেকে গল্পের ছলে

তবে ২০১৯ এ এসে তৌকির আহমেদ উপহার দিলেন এক নতুন চমক। বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে প্রথমে তিনি সযত্নে বের করে আনলেন, তারপর সেটি উপস্থাপন করলেন ব্যতিক্রমভাবে, এরপর ছড়িয়ে দিলেন দর্শকসমাজের মাঝে। এক্ষেত্রে দর্শকরাও আশাহত করেনি এই গুণী নির্মাতাকে। বরং পরিচালকের এই সাহসী উপস্থাপন তারা দেদারছে গিলেছে। গুগলের মতে, তাদের ৯৬℅ ইউজার চলচ্চিত্রটি পছন্দ করেছে।


টিটো রহমানের ‘বউ কথা কও’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘ফাগুন হাওয়ায়’ চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে।

এতে অভিনয় করেছেন সিয়াম, তিশা, যশপাল শর্মা, সাজু খাদেম, আবুল হায়াৎ, ফজলুর রহমান বাবু প্রমুখ।

ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর ব্যানারে গল্পটি প্রবাহিত হয়েছে

“পাখি, পাখিনিয়ে যান ভাই পাখিমানুষ পুইষ্যা লাভ নাই, পাখি পুষেন পাখিকথা বলা পাখি, টুনটুনি পাখি, টিয়া পাখি…”
পাখি বিক্রেতার এমন হাকডাকের মাধ্যমে শুরু হয় ২৩ ডিসেম্বর ১৯৫১ এর কোনো এক সকাল। আর এটিই চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্য।

এই চলচ্চিত্রের প্রথমভাগে দেখা যায়

দেশভাগের পর খুলনার এক প্রত্যন্ত অঞ্চল চন্দ্রনগরে এক পাকিস্তানি পুলিশ কর্মকর্তাকে তার কোনো এক অপরাধের শাস্তিস্বরূপ বদলি করা হয়। পুলিশ কর্মকর্তাটির নাম জামশেদ, যে উগ্র ও কট্টর উর্দুপ্রেমী। ফলে বাংলা ভাষাভাষী এ অঞ্চলের মানুষ যেমন তার ভাষা বোঝে না। একইভাবে, তার সামনে নিজ মাতৃভাষায়ও কথা বলতে পারে না। এক কথায়, গ্রামের সকল মানুষ জামশেদ নামক পশ্চিমাপন্থির কাছে এক প্রকার জিম্মি। অন্যদিকে নাসির এই গ্রামেরই ছেলে, পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে, ছুটিতে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরছে। পথিমধ্যে তার সাথে দীপ্তির দেখা হয়। দীপ্তি এবার ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। মাকে হারিয়েছে সে অনেক আগেই, বাবা থাকে বিলেতে। বর্তমানে চিকিৎসক দাদুর সাথে তার বসবাস। সেও ছুটিতে চন্দ্রনগরে নিজ বসতভিটায় ফিরছে। 


এ পর্যন্ত সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল কিন্তু গোলযোগ বাধে খাজা নাজিমুদ্দিনের ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে

এর পরবর্তীতে পাকিস্তানি শাসকরা যেভাবে বাঙালির অধিকার কেড়ে নিতে তৎপর হয়, ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চন্দ্রনগরে ঘটাতে থাকে পাকিস্তানি জামশেদ। বাঙালিদেরকে সে দেখে ইতরের চোখে। তার এলাকায় কেউ যাতে বাংলায় কথা বলতে না পারে সেজন্য সে একের পর এক কূটকৌশল ও কঠোর হুশিয়ারি জারি করতে থাকে, চলতে থাকে নির্যাতন-শোষণ-নিপীড়ন। যারই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় এক মৌলবীর মাধ্যমে সে থানায় উর্দু চর্চার এক পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করে। যেখানে বাঙালিদেরকে উর্দু শিখতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে জামশেদের প্রত্যক্ষ মদদে এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে পাকিস্তানের এদেশীয় দালাল ও দোসররা। সংখ্যালঘুদের উপর তখন নেমে আসে লাঞ্চনা-বঞ্চনা, বিভিন্ন উপায়ে তারা সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগে বাধ্য করতে থাকে। 


এলাকায় ‘নীল দর্পণ’ নাটকের মঞ্চায়নের কাজ করতে গিয়ে আবারও দেখা হয় নাসির ও দীপ্তির

কাজের মাধ্যমে তাদের একসাথে চলাফেরা-খুনসুটি। সেখান থেকেই দু’জনের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। আর এই বন্ধুত্বের শেষ পরিণতি ঘটে প্রণয়ে। এদিকে পশ্চিমা এজেন্ট জামশেদের আগ্রাসন কিন্তু থেমে নেই। সময়ের তালে তাল মিলিয়ে তা ক্রমবর্ধমানভাবে বেড়ে চলেছে। একসময় বিষয়টি নাসির ও দীপ্তিরও দৃষ্টিগোচর হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, যেকোনো মূল্যে পাকিস্তানি দোসরদের বিষদাঁত ভেঙে ফেলতে হবে। এর পর পর-ই মূলত শুরু হয় স্বাধীনতাকামী শক্তির সাথে পশ্চিমা অপশক্তির সম্মুখ লড়াই। 


ফাগুন হাওয়ায় তৌকির আহমেদ পরিচালিত ষষ্ঠ চলচ্চিত্র

তিনি যে দিন দিন দক্ষ হয়ে উঠছেন তার অনবদ্য প্রমাণ এই চলচ্চিত্রটি। খুব বেশিদিন হয়নি চলচ্চিত্র জগতে পা রেখেছেন সিয়াম আহমেদ। সবেমাত্র ক্যারিয়ার শুরু করা একটা মানুষ তার স্বভাবসিদ্ধ চরিত্রের জায়গা থেকে বের হয়ে, সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা চরিত্রের মধ্যে নিজেকে এতটা সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। সিয়ামকে দেখে একবারও মনে হয়নি যে এই চরিত্রটি ওর জন্য নয়। বরং মনে হয়েছে, এই চরিত্রে সিয়াম না থাকলে কোথাও একটা অসম্পূর্ণতা থেকে যেত। নুসরাত ইমরোজ তিশা সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। দিন দিন সে পরিণত হচ্ছে। এছাড়া ফজলুর রহমান বাবু, যশপাল শর্মা, আবুল হায়াৎ এর অভিনয় ছিল দুর্দান্ত। তাদের অনুপস্থিতিতে এই চলচ্চিত্র যে অস্তিত্ব সংকটে ভুগতো তা বলা বাহুল্য।


চলচ্চিত্রের গল্পের বিন্যাস আমার কাছে চমৎকার লেগেছে

উর্দুভাষী জামশেদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গ্রামের যুবসমাজের নেয়া পদক্ষেপ এবং গ্রামবাসীকে নিজের আয়ত্তে রাখতে জামশেদের করা চক্রান্ত অবশ্যই আপনার হাসির খোরাক যোগাবে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ ও পঞ্চাশের দশকের প্রেমের প্রভাব গোটা চলচ্চিত্রজুড়ে লক্ষণীয়। এছাড়া চলচ্চিত্রের ফাঁকে ফাঁকে যে লালন সংগীতের অবতারণা ঘটেছে তা এক কথায় অসাধারণ। বিশেষ করে, 
“যেদিন হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান জাতি গোত্র নাহি রবেএমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে”
গানটি যখন শুনছিলাম, মনে হচ্ছিল গানের কথা ও সুরগুলো হৃদয় স্পর্শ করে যাচ্ছে। আর সর্বশেষ আলতাফ মাহমুদের ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১শে ফেব্রুয়ারি’ গানের মাধ্যমে ফিনিশিং ছিল হৃদয় নিংড়ানো আবেগের প্রতিচ্ছবি। সাউন্ড কোয়ালিটি খারাপ ছিল না। এই চলচ্চিত্রের সম্পাদনা ও ভিএফএক্স এর কাজগুলো করা হয়েছে পার্শ্ববর্তীদেশ ভারত থেকে। 


সীমাবদ্ধতা হিসেবে, কোরিওগ্রাফি এভারেজ লেগেছে। মনে হয়েছে, ঘুরে ফিরে একটা নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতেই চরিত্রগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল।

শ্যুটিং স্পট আর দুই-একটা বেশি হলে হয়তো খারাপ লাগত না। তিশার তানপুরা বাজানোর দৃশ্যটা অনেক দৃষ্টিকটু লাগছিল। 


ভালো থাকুক ভাষা শহীদেরা, ভালো থাকুক তাদের দেশপ্রেমিক সত্তাগুলো। জয় বাংলা, বাংলার জয়

আরো রিভিউ পড়ুন


রিভিউ লেখক: তানভীর তানিম

 চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ফাগুন হাওয়ায় চলচ্চিত্র ট্রেইলার
তাকদীর ওয়েব সিরিজ

I am the Admin Of Jibhai.com and also part of jibhai.com

Leave a Comment