নিম পাতার উপকারিতা। মহা ঔষধ নিম পাতা

আমরা সবাই কমবেশি নিমপাতার নাম শুনেছি। নিমপাতা সম্পর্কে জানলেও, নিমপাতার উপকারিতা এবং অপকারিতা সম্পর্কে জানি না। তাই আজ আপনাদের জানাবো নিমপাতার উপলারিতা, অপকারিতা, নিমপাতার ঔষধী গুণাগুণ সহ সবকিছু সম্পর্কে জানবো।

নিম পরিচিতি ও উৎপত্তি স্থল

আমাদের দেশে এটি নিমপাতা নামেই বহুল পরিচিত। এর ইংরেজি নাম Neem (নিম)। বৈজ্ঞানিক নাম Azadirachta indica, অনেকে একে নিম্ব, ভেপা, তামার আরও আরও অনেক নামে ডেকে থাকে।

নিমগাছ অনেক দ্রুতবর্ধনশীল একটি গাছ। এটি বহুবর্ষজীবী মাঝারি ধরনের চিরহরিৎ বৃক্ষ। এই গাছ পরিপক্ব বয়সে ১৫ থেকে ২০ মিটার লম্বা হয়। গোড়ার ব্যাসার্ধ ৬০-৮০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। গাছ বা মোটা ডালের বাকলের রঙ গাঢ় ও অমসৃণ হলেও অপেক্ষাকৃত কচি ডালের রঙ খয়েরি। প্রতিটি পাতায় ১০ থেকে ১৭টি করে কিনারা খাঁজকাটা পত্রক থাকে, যেগুলো৬ থেকে ৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। সারা বছর পাতা গজাল্সেও, বসন্তে পাতা ঝরাকালে বেশির ভাগ পাতা ঝরে যায়। ৪৫০ থেকে ১১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নিমগাছের জন্য উত্তম। তবে যেখানে বৃষ্টি কম সেখানেও নিম খুব ভালোভাবে বৃদ্ধি পায়। নিম খরা সহনশীল। যার ফলে সৌদি আরবের পবিত্র নগরীর আরাফাতের ময়দানে নিমগাছ রয়েছে। নিম হিন্দুদের পবিত্র বৃক্ষ। দেবতার মূর্তি তৈরির কাজে নিম গাছের ব্যবহার বহুল প্রচলিত।

নিম পাতার উপকারিতা
নিম পাতার ছবি

নিম বাংলাদেশের সব জায়গায় কমবেশি দেখা যায়। তবে উত্তরাঞ্চলে বেশি দেখা যায়। এর আদি নিবাস বাংলাদেশ, ভারত আর মিয়ানমারে। বর্তমানে এ উপমহাদেশেসহ উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলীয় সবদেশেই নিমগাছের বিভিন্ন প্রজাতি ছড়িয়ে আছে। সৌদি আরবের আরাফাত ময়দানে থাকা নিমগাছ গুলো বাংলাদেশ থেকে চারা নিয়ে রোপন করা। সেখানের নিম গাছের হাজার লাখো সংখ্যা আমাদের গর্বিত করে। গাছগুলো সারি সারিভাবে দাঁড়িয়ে বাংলার ঐতিহ্যের মূর্ত প্রতীক হিসেবে জানান দেয়।

নিমগাছকে পৃথিবীর দামি বৃক্ষ বলা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিমকে ‘একুশ শতকের বৃক্ষ’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। খ্রিস্টের জন্মেরও অনেক পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে নিমগাছের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বর্তমানে সময়ে নিমের ব্যাপক আগ্রহ এবং চাহিদা দেখা যায়।

নিমের প্রকারভেদ

সাধারণত ৩ প্রকার নিম দেখা যায়। সেগুলো-

১, ইন্ডিয়ান লাইলাক – এটিকে অনেকে সাধারণ নিম বলে। প্রাপ্ত বয়স্ক হতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগে।

২, ঘোড়ানিম – অনেকে এই নিমকে আসল নিম ভাবে। এই নিম আর আসল নিম দেখতে কিছুটা বৈসাদৃশ্য রয়েছে। আসল নিম ঘনবদ্ধ পাতা ও অজস্র ডালপালায় বেশ ঝোপালো হলেও ঘোড়ানিম স্বল্প পাতা ও ডালপালায় কিছুটা বিক্ষিপ্ত। এই নিমের গুচ্ছবদ্ধ হলদেটে ফলগুলো দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। এর আরেক নাম মহানিম।

৩, মিঠো নিম – এই নিম অন্যান্য নিমের মতো তেমন তেতো নয়। এটি আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চল, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে পাওয়া যায়। সবজি হিসেবে এটি বহুল ব্যবহৃত হয়।

নিম পাতার উপকারিতা

নিমপাতার উপকারিতা সম্পর্কে সবার কম বেশি জানা আছে। আজকে নিমের উপকারিতা নিয়ে বিষদভাবে আলোচনা করবো।

ত্বকের যত্নে নিম পাতার উপকারিতা

ত্বকের যত্নে নিমপাতার ব্যবহার
ত্বকের যত্নে নিম পাতা

ত্বকের যত্নে নিমপাতা অনেক বেশি উপকারী। ত্বক ভাল রাখার জন্য প্রাচীন যুগ থেকে এর ব্যাবহার হয়ে আসছে। নিম পাতা ব্যবহারের ফলে ত্বকের জীবাণু দূর হয়। সেইসাথে ত্বকের হারানো উজ্জ্বলতা ফিরে আসে। এর বিভিন্ন ভেষজ গুণাবলী ত্বককে সুস্থ এবং দাগ মুক্ত রাখে।

নিমপাতার ফেসপ্যাক

নিমপাতার নানান উপকারিতা
নিমপাতার ব্যবহার

ত্বকের সাধারণ সমস্যা অথবা বড় কোন ক্ষতের জন্য নিমপাতার ফেসপ্যাক ব্যবহার করা যায়। ত্বকে ইনফেকশন হলে অথবা জ্বালাপোড়া করলেও নিমের ফেসপ্যাক ব্যবহার করা যায়।

নিম পাতার ফেসপ্যাক তৈরির করতে প্রথমে শুকনো পাতা গুঁড়া করে নিতে হবে। এরপর দুই চামচ নিমপাতা গুঁড়ার সাথে দুই টেবিল চামচ চন্দন পাউডার মিশিয়ে নিতে হবে। মেশানো হয়ে গেলে তার সঙ্গে সামান্য পানি ও এক চামচ গোলাপ জল মিশাতে হবে। সবকিছু দেয়ার পরে একটি মিশ্রণ করতে হবে। ফেসপ্যাক হিসেবে মুখে ব্যবহার করে বিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। বিশ মিনিট পরে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে ফেলতে হবে । এই ফেসপ্যাক আপনার উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনবে।

ক্লিনজার তৈরী

প্রথমে কয়েকটি নিমপাতা নিতে হবে। একটি পরিষ্কার হাঁড়ির ভেতরে ফুটন্ত পানিতে নিমপাতা দিয়ে আরেকবার ফোটাতে হবে। পানি সবুজ না হওয়া পর্যন্ত ফুটাতে হবে। এরপর পানি ছেঁকে ঠান্ডা করে নিতে হবে। মিশ্রণটি পরিষ্কার ও শুকনো বোতলে সংরক্ষণ করে টোনার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিষ্কার তুলোর সাহায্যে মুখে ও গলায় লাগালে ত্বক নানাভাবে উপকৃত হবে।

বয়সের ছাপ কমাতে নিমপাতা

নিমের তেলে প্রচুর ভিটামিন ই এবং ফ্যাটি এসিড থাকার ফলে নিমের তেল নিয়মিত মুখে মালিশ করলে ত্বকের অকাল বার্ধক্য দূর হয়। ভিটামিন ই তে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় এটি ত্বককে ফ্রি রেডিক্যাল থেকে মুক্ত রাখে। তাই নিমপাতা ব্যবহারে ত্বক দীর্ঘদিন সুস্থ থাকে এবং সহজে বয়সের ছাপ পড়ে না।

নিম পাতা দিয়ে ব্রণ দূর করার উপায়

নিম পাতার বিভিন্ন উপকারিতা
নিম পাতার ছবি ২

ব্রণমুক্ত সুন্দর ত্বক সবাই আশা করে। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার কারণে ব্রণ হয়। যা বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অনেকের ব্রণের কারণে মুখে দাগ হয়ে যায়।
নিমপাতা ব্যবহার করে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

নিমে থাকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান ত্বকের জন্য উপকারী। নিমপাতার সঙ্গে যদি কাঁচা হলুদ ব্যবহার করলে ত্বকের উজ্জ্বলতা দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি ব্রণের সমস্যা দূর হয়। সেইসাথে ত্বক অনেক মসৃণ হয়

নিম পাতার সাথে তুলসী পাতা ত্বকের জন্য দারুন উপকারী। দু্’টিতেই অ্যান্টিসেপটিক উপাদান থাকায় ত্বক মসৃণ করতে সাহায্য করে। এই দু’টি পাতা একসঙ্গে বেটে তার সঙ্গে এক চামচ মধু মিশিয়ে মুখে লাগালে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে।

এই আর্টিকেল পড়ুন

মুখের ছোট ছোট ব্রণ দূর করার উপায় নতুন টিপস কার্যকরী সমাধান

এলার্জির চিকিৎসায় নিম পাতার ব্যবহার

আমাদের মধ্যে অনেকেই কমবেশি এলস্ররজিতে আক্রান্ত। এলার্জির সমস্যায় অনেকেই বিরক্ত। এর সমস্যা যে কতোটা ভয়ঙ্কর, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন। এলার্জির সমস্যার কারনে পছন্দের খাবার খাওয়া যায় না। অনেকে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ রাখেন প্রিয় খাবারদাবার। এলার্জির কারণে অনেকের ত্বক চুলকাতে থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে চাকা হয়ে লাল হয়ে যায়। কারও চোখ চুলকায়, এ থেকে পানি পড়া ও চোখ লাল হয়ে ফুলে ওঠে।

নিম পাতার ব্যবহার
নিম পাতার ছবি ৩

এলার্জি থেকে মুক্তি পেতে অনেকে নিয়মিত ওষুধ খেয়ে থাকেন। অতিরিক্ত ওষুধ খাওয়ার কারনে অনেকের সাইড এফেক্ট ও দেখা দেয়। তবে ওষুধ ছাড়াও এলার্জি দূর করা যায়। নিম পাতার মিশ্রণের মাধ্যমে মাসের মধ্যে সহজ উপায়ে এলার্জিকে চিরবিদায় করা যায়। নিচে এলার্জির চিকিৎসায় নিম পাতার মিশ্রন বানানোর উপায় বর্ণনা দেয়া হলো।

প্রথমে এক কেজি নিম পাতা ভালো করে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। নিম পাতা শুকানো হয়ে গেলে ব্লেন্ডার অথবা পাটায় ভাল করে গুড়া করে নিতে হবে। গুড়া করা নিম পাতা একটি কাঁচের পাত্র বা প্লাস্টিকের পাত্রে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। কোন ভাবে যেন পাত্রে বাতাস না ঢুকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ব্যবহারের পদ্ধতি

এক চা চামচের তিন ভাগের এক ভাগ নিম পাতার গুড়া নিতে হবে। সাথে এক চা চামচ ভুষি নিয়ে ,এক গ্লাস পানিতে আধা ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। আধা ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখার পরে, চামচ দিয়ে নেড়ে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে, দুপুরে ভরা পেটে এবং রাতে শোয়ার আগে খেতে হবে। এই মিশ্রণটি নিয়মিত এক মাস খেলে এলার্জি অনেকটাই কমে যাবে।

দাঁতের যত্নে নিমের ব্যবহার

অনেকেই দাঁত ও মাড়ির সমস্যায় ভুগেন। এসব সমস্যা দূর করতে, নিম পাতা এবং ডালের ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই। নিমের রস দাঁতের জন্য খুবই উপকারী। এটি মুখের দুর্গন্ধ এবং দাঁতের জীবাণুর জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁতের ফাঁকে জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রোধ হয় এবং দাত সুস্থ থাকে।

নিম পাতার অপকারিতা

প্রতিটা জিনিসের মতো নিমেও অপকারিতা এবং পার্শপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই সঠিক নিয়ম মেনে নিমের ব্যবহার করতে হবে।

১, গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে নিম পাতা উপকারের বদলে ক্ষতি করতে পারে। তাই প্রসূতি মহিলাদের নিমপাতা খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। নিম অনেক সময় বন্ধ্যাত্বতার কারণও হতে পারে। তাই যারা সন্তানের পরিকল্পনা করছেন তারা নিম ব্যবহারে সতর্ক থাকুন।

২, যারা শল্যচিকিৎসা করেন, তাদের নিম পাতা ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। শল্যচিকিৎসার দুই সপ্তাহ পূর্বে নিমের ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে।

৩, যারা নিম্ন রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে নিমপাতা ব্যবহার করা যথাযথ নয়। এটি কেননা রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। তাই যাদের নিম্ন রক্তচাপ রয়েছে তারা নিমের ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।

৪, অনেকের অটো ইমিউন থাকে। যাদের অটো ইউমিন আছে, তাদের নিম পাতার ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে। কেননা আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা টিকে খুব সক্রিয় করে তোলে। যার ফলে অটো ইমিউন এর কারনে উপকারের বদলে ক্ষতি হতে পারে।

৫, ছোট বাচ্ছাদের ক্ষেত্রে নিম তেলের ব্যবহার কিংবা নিম তেল খাওয়ার ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। কেননা এটি শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এর ফলে বমি ভাব, দুর্বলতা মস্তিষ্কের ব্যাধি দেখা দিতে পারে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

৬, অতিরিক্ত উপকারের আশায় বেশি পরিমাণ নিম পাতা খাওয়া যাবে না। দিনে দুটোর বেশি নিমপাতা একসাথে খাওয়া উচিত না। বেশি পরিমাণে নিম পাতা খেলে উপকারের বদলে অপকার হবে।

৭, নিমপাতা খাওয়ার পরে যদি বমি, ডায়েরিয়া, মাথাব্যথা সমস্যাগুলি হয় সে ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে তা খাওয়া বন্ধ করতে হবে।

৮, আপনার শরীরের জন্য টানা কতদিন নিম পাতা খাওয়া যেতে পারে সেটা একজন বিশেষজ্ঞের থেকে জেনে নেওয়া উচিত। একনাগাড়ে এটি খেতে থাকলে শরীরের নানা ক্ষতি হতে পারে।

৯, এক নাগাড়ে বেশিদিন খালি পেটে নিম পাতা খাওয়া যাবে না। এতে উপকারের বদলে অপকার হবে।

পরিশেষে বলা যায়, নিম পাতার ভেষজ উপাদান সহ বিভিন্ন গুণাগুণ আমাদের জন্য অনেক উপকারি। তাই আমদের উচিত বাড়ির আশেপাশে নিম গাছ লাগানো এবং এর সঠিক পরিচর্যা করা।

আরো পড়ুন

আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার উপকারিতা ও খাওয়ার সঠিক নিয়ম
Jubaer Hasan Rabby

পাঠক, লেখক, ইতিবাচক চিন্তাবিদ, আশাবাদী, সংগঠক, দেশপ্রেমিক।

এই পোস্ট শেয়ার করুন

2 thoughts on “নিম পাতার উপকারিতা। মহা ঔষধ নিম পাতা”

Leave a Comment