নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা সন্মাত্রানন্দ

নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা ,অতীশ দীপংকরের পৃথিবী 
লেখক – সন্মাত্রানন্দ
প্রকাশনা- ধানসিঁড়ি  [ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সংস্করণ ]মুদ্রিত মূল্য – ৪৫০ টাকা [  রকমারি মূল্য ৮১০ টাকা

নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা


অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান। 
নামটি এ যুগের ইতিহাস বইতে শুধু একটি পংক্তির সম্মান পায়। মহাজ্ঞানী অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে গমন করেন। ব্যস। স্কুল লেভেলের ইতিহাস বইয়ের সিলেবাসে এটুকুই তাঁর স্থান। অতীশ দীপংকরের প্রখর মেধা, প্রজ্ঞা, তাঁর রচিত গ্রন্থ সমূহ, বর্তমান জগতের কাছে অজ্ঞাত বললেই হয়। এই অতীশ দীপংকরের জীবন, তাঁর সময়কাল, তাঁর সাধনা, বৌদ্ধ রীতিনীতি এবং তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কাল জুড়ে এই উপন্যাস।  

কিছুদিন আগে এই লেখকের  ছায়া চরাচর বইটি পড়েছিলাম

সেই বইএর রেশ কাটিয়ে উঠে পড়তে শুরু করলাম এই বইটি। এই বইটিতে লেখক আরেকটু জটিল হয়েছেন । ঘটনা প্রবাহ তিনটি টাইমলাইন জুড়ে ঘটিত হয় । চরিত্রগুলি এক সময়কাল থেকে আরেক সময়ে বিচরণ করে।  খুব স্বাভাবিক ভাবে যেন একটিই এসকালেটর মসৃণ ভাবে এক লেভেল থেকে আরেক লেভেলে পৌঁছে যায় । এই আঙ্গিক উনি ছায়া চরাচরে ব্যবহার করেছেন। এতেও করেছেন। দুটি বই পরপর পড়ার কারণে আমি এই চলনে অভ্যস্ত  হয়েও  মাঝে মাঝে হোঁচট খেয়েছি।  লেখক পূর্ণ মনোযোগ দাবি করেন।  পাঠক হেলা ফেলা করে পড়বে, দু এক প্যারা, কিম্বা গোটা পাতাই উল্টে চলে যাবে, সেটি হবার যো নেই। মাঝে মাঝেই ফিরে ফিরে পড়তে হয় । লেখাটির একটি অনুচ্ছেদ  কোট করছি

এ জগৎ বন্ধ্যার পুত্রের ন্যায় অলীক নয়। এ জীবন একটা আপাতত কার্য নির্বাহের ব্যবস্থা

এর একটা ব্যবহারিক বা সাংবৃতিক সত্তা আছে। আর সেই লৌকিক সত্তাকে স্বীকার ক’রে নিয়েই আমাদের দিনানুদৈনিক জীবনযাত্রা, আধ্যাত্মিক সাধন, বুদ্ধগণের আবির্ভাব, সদ্ধর্মদেশনা, সংঘপ্রতিষ্ঠা, চতুরার্যসত্য, বোধিলাভ প্রভৃতি নির্বাহ হয়। কিন্তু এসব কোনওকিছুই চরম সত্য নয়। যা পরম, তাতে জগতের অনুপ্রবেশ নাই, বুদ্ধিনিরূপিত কোনও সংজ্ঞা বা অভিধার অণুমাত্রও স্পর্শ নাই।পরম সত্য প্রপঞ্চরহিত, প্রপঞ্চশূন্য। তা উৎপন্ন হয় না, তিরোভূত হয় না, তা শাশ্বত নয়, অশাশ্বতও নয়, একপ্রকার নয়, নানাপ্রকারও নয়, তাতে আগম নাই, নির্গমও নাই।


শুধু শব্দ ব্যবহারের ঝলকানি নয়, বাক্যগুলির অন্তর্নিহিত অর্থ অনেকক্ষন ভাবনার জগতে আলোড়ন তোলে। এই লেখাটি পড়তে এই জন্যেই আমার অনেক সময় লেগেছে। পড়েছি আর ভেবেছি ! 


চন্দ্রগর্ভ ( অতীশ দীপংকরের  পুর্বাশ্রমের নাম )অতীশ দীপংকর, বিনয়ধর , চাগ লোচাবা (তিব্বতী অনুবাদক, ত্রয়োদশ শতক), বিনয়ধর ( তিব্বতী শ্রমণ, অতিশের সমকালীন) অমিতায়ুধ এবং শাওন বসু (একবিংশ শতকের চরিত্র ) একে অপরের সাথে এক অলক্ষ্য সূত্রে বাঁধা। অতীশ খুঁজে চলেছেন পরম সত্য, বিনয়ধর চাইছেন নানা বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে অতীশ কে তিব্বতে নিয়ে যেতে, চাগ লোচাবা খুঁজছেন দুই শতক পূর্বের অতীশ দীপংকরের প্রজ্ঞার আলোক। এই অন্বেষার মূল সূত্রটি বাঁধা আছে বজ্র যোগিনী তারার উপাসিকা স্বয়ংবিদার কাছে ! যুগে যুগে স্বয়ংবিদা আবির্ভূত হয়েছেন, জাহ্নবী বা কুন্তলা রুপে। রহস্যময়ী নারী পথ দেখিয়েছেন যারা পথ খুঁজে চলেছেন।

অতীশ দীপংকরের জন্ম

আমাদের বাংলাদেশেরই বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে [  আমি নিজেও বিক্রমপুরেরই নিবাসী ] । সেখানে একটি ঢিপি, নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা নামে খ্যাত। এইখান থেকে শুরু বর্তমান কালের গবেষক অমিতায়ুধের যাত্রা। বজ্রযোগিনী গ্রাম থেকে পাওয়া মূর্তির রহস্য ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে। অতীশের তন্ত্রশিক্ষা, সুবর্ণদ্বীপ অধুনা ইন্দোনেশিয়ায় গমন, অতীশের বিক্রমশিলা মহাবিহারের প্রধান আচার্য হওয়া, বুদ্ধ গয়ায় পণ্ডিতদের তর্কসভায় জয়লাভ, বুদ্ধের শিক্ষায়, বৌদ্ধ দর্শন সংক্রান্ত নানাবিধ গ্রন্থ রচনা, স্বাধ্যায়, পঠন পাঠনের মধ্যেও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে জড়িয়ে পড়া, দীর্ঘ কষ্টকর ও বিপদসংকুল পথ অতিক্রম করে তিব্বত গমন ও বৌদ্ধ ধর্ম পুনঃ প্রতিষ্ঠা এই সকল ঘটনাগুলি এক বিস্মৃত কালের তথ্য চিত্রের মতন।


অসুস্থ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন জীবন মানুষ চায় না। এই উপন্যাসের একটি চরিত্র বলছে। হায় রে! অতীশ যদি এখন আবির্ভূত হতেন । 
আরেকটি অনুচ্ছেদ কোট করছি – 


আমি কোনও মতবিশেষের অনুগামী নই

কেবল সত্যে অনুগত

কোনও মতবিশেষকেই নিরঙ্কুশ মনে করি না

এই বিশ্ব জগতের কোনও বস্তুর স্বতন্ত্র সত্তা নাই। সকলই পরস্পর নির্ভরশীল, সকলই পরতন্ত্র। এ জীবন একটা স্বপ্ন, আদিতে এ স্বপ্ন ছিল না, অন্তিমেও থাকবে না। অতএব, বর্তমানে যে এই জীবন অনুভব করছি, তার কোনও সারবত্তা নাই। বন্ধন নাই, তাই নির্বাণও নাই। নির্বাণ যদি প্রাপনীয় বস্তু হয়, তবে তার আরম্ভ থাকবে। আর যার আরম্ভ আছে, তার অন্তও আছে। ওইরূপ আরম্ভ ও অন্তযুক্ত নির্বাণ দুঃখের আত্যন্তিক নিবারণ নয়। দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখের নিবৃত্তি, নিবৃত্তি উপায় কোনও কিছুরই স্বতন্ত্র সত্তা নাই। তাই চতুরার্য সত্যকেও চরম বলা যায় না। পরমার্থত সংঘ নাই, ধর্মও নাই, বুদ্ধও নাই। এবং তথাগতও পরমার্থত সত্য নন। নির্বাণলাভের পূর্বে ও পরে তথাগত আছেন, তথাগত নাই, তথাগত এককালে আছেন এবং নাই, তথাগত অস্তি-নাস্তি-অনুভয় ইত্যাকার কোনও কিছুই প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এই সমস্ত জগৎ স্বতন্ত্রসত্তারহিত শূন্য।”


তিব্বত যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন, অবৈদিক যাগযজ্ঞ, নির্বিচারে পশুবলি, বামাচার ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ, তখন অতীশ দীপংকরের দিশায় তিব্বতে শান্তি কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়।  এই লেখা ঘন আঁধারের পথ চিরে আলোকমালার সন্ধানের ইতিবৃত্ত।
আমরা সব সময়েই এক মেসায়ার আশায় থাকি। যিনি প্রবল দুঃসময়ে আমাদের পথ দেখাবেন।যদি অতীশ এখন আবির্ভূত হতেন !

বই কিনতে এখানে

আরও বই রিভিউ সমূহ

দ্বিপ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

I am the Admin Of Jibhai.com and also part of jibhai.com

Leave a Comment