থ্যালাসেমিয়া কি? কেন হয়? রোগীর চিকিৎসা, খাবার তালিকা।

By Jubaer Hasan Rabby

থ্যালাসেমিয়া

আমাদের দেশ সহ সারা বিশ্বে থ্যালাসেমিয়া একটি বহুল পরিচিত রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার সাত শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। থ্যালাসেমিয়া বাহকদের পরস্পরের মধ্যে বিয়ের মাধ্যমে প্রতি বছর নতুন করে ৭ হাজার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম হচ্ছে। আসুন জেনে নিই থ্যালাসেমিয়া কি।

থ্যালাসেমিয়া কি?

থ্যালাসেমিয়া বংশগত একটি রক্তরোগ। জিনের মাধ্যমে রোগটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। রক্তের লোহিত রক্তকণিকায় হিমোগ্লোবিন থাকে। যার মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন সরবরাহ হয়। আলফা চেইন ও বিটা চেইন নামক দুই রকম চেইনের সমন্বয়ে এই হিমোগ্লোবিন তৈরি হয়। এর যে কোন একটিতে সমস্যা হলে হিমোগ্লোবিনের উৎপাদন ব্যাঘাত ঘটে। যা থেকে ত্রুটিপূর্ণ হিমগ্লোবিন তৈরী হয়। স্বাভাবিক লোহিত কণিকার আয়ুষ্কাল ১২০ দিন। ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিনের কারণে এই লোহিত কণিকার আয়ুষ্কাল কমে যায়। যার ফলে লোহিত কণিকাগুলো সহজেই ভেঙে যায়। তাই শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।

থ্যালাসেমিয়ার প্রকারভেদ

থ্যালাসেমিয়া প্রধানত দুই প্রকার।

১, আলফা থ্যালাসেমিয়া।
২, বিটা থ্যালাসেমিয়া।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলফা থ্যালাসেমিয়া তীব্র হয় না। অনেক সময় উপসর্গ বোঝা যায় না। রোগী স্বাভাবিক জীবন যাপন করে। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীই বিটা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই থ্যালাসেমিয়া আবার দুই ধরনের হতে পারে। বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনরে আক্রান্ত রোগীদের থ্যালাসেমিয়ার ক্যারিয়ার বা বাহক বলা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এদের শরীরে থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায় না। অনেকে অজান্তেই সারা জীবন এই রোগ বহন করে চলে। কখনো মৃদু রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। অপরটি হলো থ্যালাসেমিয়া মেজর। মা ও বাবা উভয়ই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে শিশুর থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে শতকরা ২৫ ভাগ। বাহক হওয়ার ঝুঁকি থাকে শতকরা ৫০ ভাগ। থ্যালাসেমিয়ার উপসর্গ থ্যালাসেমিয়া রোগের ধরনের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। বিটা থ্যালাসেমিয়া এবং কিছু ধরনের আলফা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত বেশিরভাগ শিশুর মধ্যে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস

থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে প্রতিবছর ৮ মে পালিত হয় বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। ২০০৯ সালে প্রথম এই দিবসটি পালন করা হয়। সারাবিশ্বের মতো আমাদের দেশেও থ্যালাসেমিয়া দিবস পালন করা হয়। এই দিবসকে ঘিরে একেক বছর একেক প্রতিপাদ্য দেওয়া হয়।

থ্যালাসেমিয়া কেন হয়?

সাধারণত ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জীনের কারণে থ্যালাসেমিয়া হয়। এটি পূর্বপুরুষ থেকে পরবর্তী কারো হয়। বাবা এবং মা উভয়ের অথবা বাবা অথবা মা যেকোনো একজনের থ্যালাসেমিয়া জীন থাকলে এটি সন্তানের মধ্যে ছড়াতে পারে। বাবা এবং মা উভয়ের থ্যালাসেমিয়া জীন থাকলে সেক্ষেত্রে শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ২৫ ভাগ।

থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ

যেহেতু থ্যালাসেমিইয়া একটি রক্তস্বল্পতাজনিত রোগ। তাই এর উপসর্গগুলোও রক্তস্বল্পতাজনিত হয়। ক্লান্তি অনুভব, অবসাদ, শ্বাসকষ্ট হওয়া, ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। রক্ত অধিক হারে ভেঙে যাওয়ার কারনে জন্ডিস হয়ে ত্বক হলুদ হয়ে যায়। জন্ডিসের কারণে প্রস্রাবও হলুদ হতে পারে। প্লীহা বড় হয়ে যায়। যকৃৎও বড় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অস্থির ঘনত্ব কমে যেতে পারে। নাকের হাড় দেবে যায়, মুখের গড়নে পরিবর্তন আসে। শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দিনে দিনে জটিলতা বাড়তে থাকে।

যারা থেলাসেমিয়া মেজর বা থেলাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়েটে আক্রান্ত, বাবা ও মা উভয়ের থেকে ত্রুটিপূর্ণ জিন যারা পেয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ডেভলপমেন্টাল মাইল্ডস্টোনগুলো কমে যায়। বয়সের তুলনায় স্বাভাবিক বৃদ্ধি কমে যায়। একজন ১৫ বছরের কিশোরকে ১০ বছরের মতো দেখতে লাগে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে করে ললাটের হাড় মোটা হয়ে যায়। সামনের দিকে ঝুঁকে গিয়ে, হাড়গুলো স্পষ্ট বোঝা যায়, এর কারণে ঠোঁট দুটো লেগে থাকে। আস্তে আস্তে ফাঁক হয়ে যায়। নাকটা একটু চাপা থাকে, দুই চোখের মাঝখানে নাকের গোঁড়ার দূরত্ব আস্তে আস্তে বেড়ে যায়। হাড় বাড়ার কারণে এই ধরনের পরিবর্তন ঘটে। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বাচ্চা দুর্বল, তার কার্যক্রম সন্তুষ্টজনক নয়। কাজে বা চলতে তেমন শক্তি পায় না। এর সাথে রক্তস্বল্পতা, জন্ডিস, এনিমিয়া পাওয়া যাইয়। অনেক সময় পেট ফুলে যায়।

থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা

যে কোন রোগের ক্ষেত্রে প্রথম মাথায় আনা হয় এর চিকিৎসা। থ্যালাসেমিয়াও ঠিক তেমন। সাধারনত মাইনর (ট্রেইট) থ্যালাসেমিয়াইয় সাধারণত কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। আমাদের দেশের ১০ ভাগ মানুষ জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে। অধিকাংশ বাহকেরা জানতেও পারে না যে তারা বাহক।

দুজন বাহকের বিয়ে হলে সর্বনাশ। এদের পঁচিশ শতাংশ বাচ্চা থালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পঞ্চাশ শতাংশ হবে ক্যারিয়ার। তবে একজন বাহক আর একজন বাহক নন এমন ব্যক্তির মধ্যে বিয়ে হলে কোনো ভয় নেই। এখানে বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

থ্যালাসেমিয়া মেজর হলে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা দুই ভাবে হয়ে থাকে।

১, রক্তস্বল্পতাকে ঠিক করা

রক্তস্বল্পতা ঠিক রাখতে নির্দিষ্ট সময় পর পর শরীরে নতুন রক্ত দিতে হয়। কেননা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত মানুষের শরীরে ত্রুটিপূর্ণ রক্ত থাকে। তাই এই রক্তের পরিবর্তে নতুন রক্ত দিতে হয়।

তবে এই রক্ত সঞ্চালনের করায় অনেক সময় শরীরে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বারবার রক্তসঞ্চালনের ফলে, যকৃতসহ বিবিধ অঙ্গে অতিরিক্ত লৌহ জমে যায়। এ ধরনের জটিলতা দূর করতে আয়রন চিলেশন থেরাপি এবং খাদ্যগ্রহণের পর চা পানের অভ্যাসকে তৈরী করতে বলা হয়।

২, একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় রক্ত বজায় রাখা। যেন তার শারীরিক গঠনের পরিবর্তন না ঘটে।

থ্যালাসেমিয়ার আধুনিক চিকিৎসা হলো অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন। এটি থ্যালাসেমিয়ার একটি কার্যকরী আধুনিক চিকিৎসা। কিন্তু এই চিকিৎসা ব্যয়সাপেক্ষ। অনেকসময় প্লীহা বেশি বড় হয়ে গেলে সার্জারির মাধ্যমে প্লীহা অপসারণেরও প্রয়োজন পড়তে পারে।

যে অঙ্গ দিয়ে সমস্যাযুক্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি হচ্ছে, সে অঙ্গ মানে বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জা সংযোজনের মাধ্যমে একে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।

হোমিওপ্যাথিতে অনেক প্রকার জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব, যা এ্যালোপ্যাথিতে কোনো দিনই সম্ভব না। হোমিওপ্যাথি লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা তাই রোগীর লক্ষণকে সামনে রেখে ঔষধ প্রয়োগ করলে রোগীর সে কষ্টকর লক্ষণগুলি চলে যাবে এবং রোগী রোগ মুক্ত হয়ে যাবে।

থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসায় প্রচুর টাকা খরচ হয়। তাই মধ্যবিত্ত বা দরিদ্ররা এই রোগে আক্রান্ত হলে ভিখারী হতে বেশী সময় লাগে না। চিকিৎসা করা হলেও শিশুদেরকে সাধারনত বিশ- এিশ বছরের বেশী বাঁচানো যায় না। এটি একটি মারাত্মক জেনেটিকাল রোগ হওয়ায় , এটাকে নিরাময় অযোগ্য বলে ধরা হতো। তবে বর্তমানে বিভিন্ন দেশের অনেক হোমিও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অনেক থ্যালাসেমিয়া রোগীকে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য করার দাবী করেছেন। যাদের ডিসচার্জ করার ৫-৬ বছর পরেও রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

অনেক সময় অনেক কঠিন রোগের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথির অবদান দেখা যায়।
হোমিওপ্যাথির দুইশ বছরের ইতিহাসে কঠিন রোগও খুব সহজে নিরাময় করতে দেখা যায়। যা অন্যান্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবিশ্বাস্য মনে করা হয়। হোমিও স্পেশালিষ্টদের ভাষ্যমতে, শতকরা পঞ্চাশভাগ থ্যালাসেমিয়া রোগীকে হোমিও চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ মুক্ত করা সম্ভব। অবশিষ্ট পঞ্চাশ শতাংশ থ্যালাসেমিয়া রোগীরা সম্পূর্ণ রোগমুক্ত না হলেও, অভিজ্ঞ হোমিও চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নিলে মাসে বা বছরে একবার রক্ত নিলেই চলে।

থ্যালাসেমিয়া রোগের দুইটি পর্যায় রয়েছে। একটি হলো প্রাথমিক পর্যায় অন্যটি মাঝারি থেকে মারাত্মক। দুইটি পর্যায়ের জন্য আলাদা চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

হোমিওপ্যাথি ধীর প্রকৃতির চিকিৎসা। তাই এই চিকিৎসা ধৈর্য সহকারে করতে হয়।
প্রাথমিক থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে লক্ষণ ও উপসর্গ বেশি নয়। তাই খুবই অল্প চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কোন বড় অপারেশন করা হলে অথবা গর্ভবতী মা সন্তান প্রসবের পর অথবা অন্য কোনো কারণে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

থ্যালাসেমিয়া মাঝারি বা মারাত্মক পর্যায়ের হলে রোগের পর্যায় অনুসারে বছরে বেশ কয়েকবার রোগীকে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ধৈর্য্য ধরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।

থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। নিজে নিজে বা অনভিজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবার

থ্যালাসেমিয়া রোগের ক্ষেত্রে খাবারের ব্যাপারে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। কেননা খাবারের সঠিক নিয়মের অভাবে রোগ বেড়ে যেতে পারে। চলুন জেনে নিই থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবার। এই খাবার তালিকা পনুসরণ করলে আশাকরি রোগের ক্ষেত্রে সুফল মিলবে।

থ্যালাসেমিয়া রোগীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লৌহ জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে। যে সমস্ত খাবারে লৌহের পরিমাণ কম , সেই সমস্ত খাবার খেতে হবে।

যেসব খাবার পরিহার করতে হবে

১, গরুর মাংস, খাসীর মাংস, কলিজা, ডিমের কুসুম, ইলিশ, কৈ, চিংড়ি, চিতল, শিং, টেংরা ও ছোট মাছের শুটকি এসব খাবারে অধিক পরিমাণ লৌহ থাকে। তাই থ্যালাসেমিয়া রোগীর ক্ষেত্রে এসব খাবার পরিহার করতে হবে।

২, কচুশাক, লালশাক, পালংশাক, পুইশাক, ফুলকপি শাক, পুদিনাপাতা, ধনেপাতা, ফুলকপি, সিম, বরবটি, মটরশুঁটি, কাঁকরোল, কাচা পেপে, সাজনা, কাচা টমেটোতে অধিক পরিমাণে লৌহ রয়েছে। তাই এসব খাবার খাওয়া যাবে না।

৩, ফলমুল শরীরের জন্য উপকারী হলেও আনারস, বেদানা, শরিফা, খেজুর, তরমুজ থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। তাই এসব ফল খেতে দেওয়া যাবে না।

৪, এমন কিছু শষ্য জাতীয় খাবার রয়েছে, যার মধ্যে অনেক লৌহ রয়েছে। সেগুলো হলো খৈ, কর্ণ ফ্লেক্স (Corn Flakes), শিশু খাদ্য যেখানে লৌহ সংযুক্ত করা আছে যেমন- সেরিল্যাক(cerelac), কাউ এবং গেট (cow & gate) ইত্যাদি।

৫, ছোলা, ছোলার ডালে অধিক পরিমাণে লৌহ রয়েছে। তাই এগুলো গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

৬, গুড়, বাদাম (almonds), চীনাবাদাম, কিসমিস, তিল, পান, জিরা, ধনে, সরিষায় লৌহের পরিমাণ বেশি। তাই রোগীকে এসব খেতে দেওয়া যাবে না।

যেসব খাবার খাওয়া যাবে

১, রুই, কাতল, পাংগাস, বোয়াল, মাগুর, সরপুঁটি, শোল মাছে লৌহের পরিমাণ কম থাকে। তাই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের এসব খাবার খেতে দিতে হবে।

২, কিছু শাক সবজিতে লৌহের পরিমাণ কম থাকে। এসব সবজি রোগীরা খেতে পারে।
যেমন বাঁধাকপি, মিষ্টি আলু, করলা, মিষ্টি কুমড়া, ঢেড়স, মূল্য, শালগম, কাচা কলা, ঝিংগা, পাকা টমেটো, লাউ, চাল কুমড়া।

৩, পাকা আম, লিচু, কলা, পাকা পেপে, কমলালেবু, বেল, জামরুল, আমলকি, কাগজী লেবু, পেয়ারা, আঙ্গুর এসব ফলে কম পরিমাণে লৌহ থাকে। তাই এসব ফল খেতে কোন নিষেধ নেই।

৪, চাল, ময়দা, পাউরুটিতে লৌহের পরিমাণ কম। থ্যালাসেমিয়া রোগীকে এসব খেতে দেওয়া যেতে পারে।

৫, অন্যান্য ডালের তুলনায় মসূর ডালে কম পরিমাণে লৌহ রয়েছে।

৬, মধু, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার যথা- দই, ছানা, পনির, রসগোল্লা ইত্যাদিতে কম পরিমাণে লৌহ রয়েছে।

এছাড়াও থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবার এর বিষয়ে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।

থ্যালাসেমিয়া টেস্ট পদ্ধতি

আপনি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত নাকি সেটি লক্ষণগুলো দেখলেই জানতে পারবেন। অনেক সময় মাইনর থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো বুঝা যায় না। আপনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সেটি লক্ষণের দ্বারা বুঝতে না’ও পারেন। তবে আপনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক নাকি সেটা নিশ্চিত হতে আপনার বংশের ইতিহাস ঘাটতে পারেন। আপনার বংশের কেউ বা পূর্বপুরুষ কেউ আক্রান্ত থাকলে টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত হতে পারবেন।

থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে দুইটি টেস্ট করা হয়। টেস্ট দুটো হলো সিবিসি এবং হিমোগ্লোবিন টেস্ট। সিবিসি টেস্ট করালে রক্তে উপস্থিত হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ, রক্ত কণিকাগুলোর নির্দিষ্ট সংখ্যার হিসেব পাওয়া যায়। অন্যদিকে হিমোগ্লোবিন টেস্ট করিয়ে হিমোগ্লোবিন ধরন, এতে উপস্থিত আলফা ও বিটা চেইনের গঠন এসব দেখে একজন মানুষের থ্যালাসেমিয়া পজিটিভ নাকি নেগেটিভ সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়।

থ্যালাসেমিয়া টেস্ট করাতে খরচ

যে কোন সরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়গনস্টিক সেন্টারে সিবিসি এবং হিমোগ্লোবিন টেস্ট করাতে পারবেন। স্থানভেদে একেক জায়গায় একেকরকম খরচ লাগতে পারে। তবে আনুমানিক এক থেকে দেড় হাজার টাকা লাগতে পারে। এই রিপোর্ট পেতে সময় লাগবে সাত থেকে পনেরো দিন।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের উপায়

থ্যালাসেমিয়া একটি জিনগত রোগ। এটিকে পুরোপুরীভাবে প্রতিকার করা না গেলেও, প্রতিরোধ করা সম্ভব। তার জন্য আমাদের সকলের প্রচেষ্টা জরুরী। চলুন জেনে নিই প্রতিরোধের উপায় –

১. দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই রোগ সম্বন্ধে সচেতন করতে হবে। তার জন্য বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। টেলিভিশন, রেডিওতে সচেতনতা মূলক গান, নাটক, উপদেশ প্রচার করতে হবে। পাশাপাশি খবরের কাগযে সচেতনতামূলক ফিচার প্রকাশ করতে হবে। নিয়মিত ক্রোড়পত্র, পোস্টার, লিফলেট ইত্যাদি বিতরণ করতে হবে।

২. থ্যালাসেমিয়া মহামারী থেকে মুক্তি পেতে, এ রোগের বাহকদের শনাক্ত করতে হবে। এজন্য ব্যাপক স্ক্রিনিং কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বাহকদের চিহ্নিত করে তাদের প্রত্যেককে বংশবিষয়ক পরামর্শ প্রদান করতে হবে। দু’জন বাহক যদি একে অন্যকে বিয়ে না করে তাহলে কোনো শিশুরই থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাই বিবাহের পূর্বে রক্ত পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৩. দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হয়ে গেলে, সন্তান গর্ভধারণের অনতিবিলম্বে বিশেষ ধরনের পরীক্ষার দ্বারা নির্ণয় করা যায় গর্ভস্থিত সন্তান সুস্থ হবে, না-কি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হবে। এই পরীক্ষাকে ‘প্রি-নেটাল ডায়াগনোসিস’ বলে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ঢাকা শিশু হাসপাতালে এই পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। এটা গর্ভাবস্থার ১৬ সপ্তাহ বা এরপর করা যায়। এই পরীক্ষার ফলে যদি দেখা যায়, সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে তবে তারা আগত সন্তানের মারাত্মক পরিণতির কথা চিন্তা করে গর্ভপাত করানোর সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। এভাবে আক্রান্ত সন্তান প্রতিরোধ করা সম্ভব।

উপরোল্লিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা গেলে, হয়তো একদিন আমাদের দেশ থেকে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। সাইপ্রাসে এক সময় থ্যালাসেমিয়া খুব বেশি ছিল। উপযুক্ত প্রচার এবং প্রতিরোধের ফলে তা আজ প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। আমরাও একদিন থ্যালাসেমিয়া শূন্যের কোটায় নেমে আসবো। রলতস্বল্পতায় কারো মৃত্যু হবে না।

আরো পড়ুন থাইরয়েড কি? কেন হয়? লক্ষণ কি? এ থেকে মুক্তির উপায় জানুন

Leave a Comment