তেতুল বনে জোছনা বই রিভিউ।। হুমায়ুন আহমেদ

তেতুল বনে জোছনা
হুমায়ুন আহমেদ

লেখক পরিচিতি

জন্ম: ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮,নেত্রকোণা জেলা,গ্রাম কুতুবপুর।
আত্মপ্রকাশ : নন্দিত নরকে (নিম্নবিত্ত এক পরিবারের যাপিত জীবনের আনন্দ-বেদনা,নিয়ে নির্মিত)
ভ্রমণকাহিনী,রুপকথা,শিশুতোষ, কল্পবিজ্ঞান, কলামসহ সাহিত্যের বহু শাখায় বিচরণ।
মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক: জোছনা ও জননীর গল্প, ১৯৭১,আগুনের পরশমনি,শ্যামল ছায়া,নির্বাসন।
পেশা: লেখক,নাট্যকার,চলচ্চিত্রকার,শিক্ষক।
জনপ্রিয় চরিত্র হিমু এবং মিসির আলীর স্রষ্টা।

লেখকের প্রকাশিত অন্যান্য বই

  • মৃন্ময়ী
  • আমিই মিসির আলী
  • বৃষ্টি বিলাস
  • শুভ্র
  • জোছনাত্রয়ী
  • অদ্ভুত সব উপন্যাস
  • নির্বাচিত কিশোর উপন্যাস
  • কানী ডাইনি
  • নির্বাচিত প্রেমের উপন্যাস

পুরস্কার

একুশে পদক,বাংলা একাডেমি পুরষ্কার, শিশু একাডেমি পুরষ্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পুরষ্কার, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক,অতীশ দীপংকর স্বর্ণপদক প্রভৃতি।

মৃত্যু :১৯ জুলাই ২০১২

বই প্রসঙ্গ

প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০০১
প্রকাশক: অন্যপ্রকাশ
মূল্য : ১০০ টাকা
উৎসর্গ: হায়াৎ মাহমুদ

গল্পের চরিত্রসমূহ

  • আনিস ডাক্তার
  • নবনী
  • চেয়ারম্যান সাব
  • আজিজ মিয়া
  • ইমাম সাব
  • ইমামা সাহেবের দুই মেয়ে
  • মতি মিয়া
  • সুজাত মিয়া
  • মর্জিনা
  • বিরাটনগর গ্রামবাসী
  • নবনীর বাবা,শশুর, শাশুড়ী

তেতুল বনে জোছনা গল্পের কাহিনী:

গল্পের কাহিনী শুরু হয় ঝড় বৃষ্টি মাছ ধরা নিয়ে।এতো মাছ যে মাছের জাল দরকার নাই,,হাত দিয়েই মাছ ধরা যাবে।বিরাটনগর গ্রামের নতুন ডাক্তার আনিসুর রহমান ঠাকুর।মুসলমান ডাক্তারের নাম কেন ঠাকুর তা গ্রামবাসী বের করতে পারে না।আনিস সাইকেল চালিয়ে গ্রামবাসীর কাছে তার চিকিৎসা পৌঁছে দেয়।এজন্য তাকে সাইকেল ডাক্তার বলে ডাকে। এতে আনিসের অনেক অদ্ভুত রকমের অনুভব হয়। সে মনে মনে ভাবে ভাগ্যিস সে ঘোড়া চালায় না, নইলে তাকে ঘোড়া ডাক্তার বলে ডাকতো গ্রামবাসী। হাহা

গল্পের এক হাস্যরসাত্নক চরিত্র মতি।হুমায়ুন আহমেদ এর গল্পে হাস্যরসাত্নক কোন চরিত্র থাকবে না তা কি করে হয়। মতি এক চালাক ভন্ড মানুষ। পাঁচটা কথার মধ্যে চারটাই সে মিথ্যে বলে। সাইকেল ডাক্তার এর সাইকেল চুরি করে নিজেই আবার সাইকেল এর জন্য মায়া কান্না করে ডাক্তার সাবকে সমবেদনা জানায়।এরকম আচরণ ভন্ড ছাড়া আর কে করতে পারে।

মতি আবার মর্জিনার প্রেমে অন্ধ। মর্জিনার জন্য তার মনে বড়ই মায়া।এজন্য মতি মর্জিনার জন্য মরা পাখির মাংস রান্না করে নিয়ে গেছে সোহাগ দেখাতে।মর্জিনা পিছনে মরা পাখির মাংসের কথা জেনে মতির প্রতি ভালোবাসা জন্মানো তো দূর কথা আরও বমি করে দেয়। আহারে বেচারা মতি!!

এবার আসি আনিস আর নবনীকে নিয়ে।নবনীর চা পান করার অভ্যাস আর আনিসের সিগারেটের। নবনীর একদম সহ্য হয় না সিগারেটের গন্ধ। এজন্য আনিস সিগারেট ছাড়ার ব্রত নিয়েছে।কিন্তু যতই ছাড়তে চাচ্ছে আরো আষ্টেপিষ্টে বেঁধে রাখছে এই সিগারেটের ধোঁয়া।নবনীর অর্কিডের নেশা।সে আনিসকেও দিয়েছে অর্কিড।নবনীর এক রোগ রয়েছে যা গল্প পড়লে ভালো করে জানতে পারবে পাঠক।নবনী ঘুমের মধ্যে প্রায়শই দুঃস্বপ্ন দেখে।এই দুঃস্বপ্ন দেখা তার পিছু ছাড়ে না।ডাক্তার তাকে ঘুমের ঔষধ দিয়েছে খেতে কিন্তু নবনীর তো ঘুমে কোন সমস্যা নাই!!

নবনী পরে তার এই দুঃস্বপ্ন দেখার কারণ জানতে পারে।আসলে নবনী তার আনিসের সাথে বিয়ে নিয়ে দ্বিধায় ছিল।তার মনে হচ্ছিল তারা একে অন্যের জন্য তৈরী হয় নি।নবনী যদি তেল হয়, তাহলে আনিস পানি।আর তেল জল কখনো মেশে?

যদিও নবনীর ভুল পরে ভাঙতে দেড়ি হয় নাই।পুরো গল্পে আনিসকে একজন সাদা মনের মানুষ মনে হয়েছে।কোনকিছু নিয়েই তার অতিআগ্রহ নেই। সাধারণ ভাবে জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত সে। আনিস নবনীর কোন কথায়ই বিরোধ করে না।এদিক থেকে আনিস একজন আদর্শ স্বামী। কিন্তু এতো কিছুর পরেও নবনীর মনে হতো যে তারা দুজনেই ভালো মানুষ কিন্তু একে অন্যের জন্য ভালো নয়।এই জন্য নবনী এক খুব বড় রকমের এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যার জন্য আনিস উদাসীন মনে শশ্মান ঘাটে বসে ফুপিয়ে কাঁদে তবে কি সেই বড় রকমের সিদ্ধান্ত সেটা পাঠক কে বই পড়ে বের করতে হবে।

এবার গল্পের আরেক ছোট চরিত্র ইমাম সাহেবকে নিয়ে বলি।গ্রামের চেয়ারম্যান অতি ধূর্ত প্রকৃতির মানুষ। ইমামসাহেব কে ছলেবলে এমনভাবে ফাঁসায় যার পরিণতিতে ইমাম সাহেব আত্নহত্যা করে।এখানে টুইস্ট আছে।কি কারণে আত্নহত্যা করে, ঘটনার পিছনেও ঘটনা রয়েছে।আবার ইমামসাহেব আত্নহত্যা করার দরুণ মতি মিয়া এই সুযোগে সবাইকে ইমাম সাহেবের ভূত সেজে ভয় দেখায়।কেউ এই ছলনা ধরতে না পারলেও নবনী ঠিকই ধরতে পারে মতির মতলবি।সত্যি বলতে আমাদের গ্রামাঞ্চলে যেসব ভুতপ্রেতের কাহিনি প্রচলিত আছে তার পিছনে মতির মতন লোকেরা রয়েছে না তো??

কিছু বাক্য গল্প থেকে :

★আছরের ওয়াক্তে কিয়ামত হবার কথা
★বর্তমান ডাক্তারের নাম আনিসুর রহমান ঠাকুর।
★আসিয়াছে!আসিয়াছে!জ্বর নাশক জ্বরমতি বড়ি!
★ডাক্তারকে সবাই সাইকেল ডাক্তার বলে ডাকে।
★চেয়ারম্যান সাহেব: স্ত্রীদের ইউনিভার্সিটি হলো তাদের স্বামী। এর বাইরে কোন ইউনিভার্সিটি নাই। (রসাত্মক)
★ষাড়ের নাম জুম্মা খান
★গত সোমবারে হাসানের ছেলে দুধ নিয়ে গেল,ইমাম সাহেব দরজা লাগায়ে দিল।
★এডগার এলেন পোর একটি কবিতা:”It was many and many a years ago
In a kingdom by the sea
That a maiden there lived whom you may know
By the name of Annabel Lee;
And this maiden she lived with no other thought
Than to love and be loved by me.
★অামার যত সমস্যাই থাকুক,আমি পছন্দ করার মতো মেয়ে
★ইমাম সাহেবকে নেংটা করে স্কুলের মাঠে চক্কর দেওয়ানো হবে।
★তুমি আমার জন্যে দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ-তার প্রতিদানে আমি “
জনম জনম কাঁদিব”

এই ছিল তেঁতুল বনে জোছনার বই রিভিউ। আমার মতে রেটিং ৮/১০. এবং বইটির শেষের দিকের বাক্যটি আমাদেরকে বেঁচে থাকার আশা জোগায়।

“রহস্যে ভরা এই মানব জীবনটাকে লোকে যত খারাপ বলে,-আসলে তত খারাপ না”।!!

Leave a Comment