কবি শঙ্খ ঘোষ

বাংলা সাহিত্যের যাত্রা কবে থেকে শুরু হয়েছে সেটা হয়তো অনেকেই অনেক সূত্র বা গবেষণা দিয়ে ব্যাখ্যা করলেও , বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি গড়ার জন্য যারা তাদের জীবনে সবটা সময় কাগজে কলম ঘঁষে গিয়েছেন তাদের মধ্যে একজন নক্ষত্র ছিলেন কলকাতার বাঙালি কবি ও সাহিত্য সমালোচক শঙ্খ ঘোষ।

মহাভারতের অন্যতম চরিত্র হস্তিনাপুরের রাজা পান্ডু, যার পাঁচটি পুত্র ছিল। এই পাঁচ পুত্রকে একত্রে পঞ্চ পান্ডব বলা হয়।পৌরাণিক কাহিনী মহাভারতের এই চরিত্র নিয়ে বাঙালি জাতির অধিক আগ্রহের ফলে কোন না কোনভাবে পাঁচ টা সফলতা একসাথে হলেই বাঙালি হৃদয় চিৎকার করে বলে ওঠে : “এরে এরা তো পঞ্চ পান্ডব! “বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ পরবর্তী সময়ে বাংলা আধুনিক কবিতার পঞ্চপাণ্ডব ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উৎপল কুমার বসু এবং শঙ্খ ঘোষ। প্রথম চারজনকে আমরা আগেই হারিয়েছি। আর এবার শঙ্খ ঘোষের বিদায় শেষে হয়ে গেল সাহিত্যের একটা যুগের। 


শঙ্খ ঘোষের আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। তার বাবা মণীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং মা অমলা ঘোষ। ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বর্তমান চাঁদপুর জেলায় তাঁর জন্ম। বংশানুক্রমিকভাবে পৈতৃক বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়ায়। তবে শঙ্খ ঘোষ বড় হয়েছেন পাবনায়। বাবার কর্মস্থল হওয়ায় তিনি বেশ কয়েক বছর পাবনায় অবস্থান করেন এবং সেখানকার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৫১ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।


[“যা কিছু আমার চার পাশে স্বচ্ছ

স্নাত শরীর

ভোরের শব্দ

শ্মশান শিব

যা কিছু আমার চার পাশে মৃত্যু

একেক দিন

হাজার দিন

জন্ম দিন

সমস্ত একসঙ্গে ঘুরে আসে স্মৃতির হাতে

অল্প আলোয় বসে থাকা পথ ভিখারি

যা ছিল আর যা আছে দুই পাথর ঠুকে

জ্বালিয়ে নেয় এতদিনের পুনর্বাসন …”

পুনর্বাসন- শঙ্খ ঘোষ ]

কর্মজীবনে শঙ্খ ঘোষ যাদবপুর ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৯২ সালে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা ভূমিকায় দেখা গেছে কবিকে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বভারতীর মতো প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনাও করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব আইওয়ায় ‘রাইটার্স ওয়ার্কশপ’-এও শামিল হন। তাঁর সাহিত্য সাধনা এবং জীবনযাপনের মধ্যে বারবার প্রকাশ পেয়েছে তাঁর রাজনৈতিক সত্তা। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে বারবার তাঁকে কলম ধরতে দেখা গেছে। প্রতিবাদ জানিয়েছেন নিজের মতো করে। ‘মাটি’ নামের একটি কবিতায় নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।


[মাটি – ‌শঙ্খ ঘোষ


আমারই হাতের স্নেহে ফুটেছিল এই গন্ধরাজ

যে–‌কোনো ঘাসের গায়ে আমারই পায়ের স্মৃতি ছিল

আমারই তো পাশে পাশে জেগেছিল অজয়ের জল

আবারও সে নেমে গেছে আমারই চোখের ছোঁয়া নিয়ে

কোণে পড়ে–‌থাকা ওই দালানে দুপুরে ভাঙা থামে

আমারই নিঃশ্বাস থেকে কবুতর তুলেছিল স্বর

শালবন–‌পেরনো এ খোলা মাঠে মহফিল শেষে

নিথর আমারই পাশে শুয়েছিল প্রতিপদে চাঁদ।

তোমাদের পায়ে পায়ে আমারও জড়ানো ছিল পা

তোমরা জানোনি তাকে, ফিরেও চাওনি তার দিকে

দুধারে তাকিয়ে দেখো, ভেঙে আছে সবগুলি সাঁকো

কোনখানে যাব আর যদি আজ চলে যেতে বলো।


গোধূলিরঙিন মাচা, ও পাড়ায় উঠেছে আজান

এ–‌দাওয়ায় বসে ভাবি দুনিয়া আমার মেহমান।

এখনও পরীক্ষা চায় আগুনসমাজ

এ–‌মাটি আমারও মাটি সেকথা সবার সামনে কীভাবে প্রমাণ করব আজ।]

বাংলা কবিতার জগতে শঙ্খ ঘোষের অবদান অপরিসীম। ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ হিসেবেও তাঁর নামডাক ছিল। ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ। ‘শব্দ আর সত্য’, ‘উর্বশীর হাসি’, ‘এখন সব অলীক’ উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ। তাঁর লেখা ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’, ‘জন্মদিনে’, ‘আড়ালে’, ‘সবিনয়ে নিবেদন’, ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ‘বাবরের প্রার্থনা’ বছরের পর বছর দুই বাংলায় চর্চিত, জনপ্রিয়।


২০১৯ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে রের হয় ‘সন্ধ্যানদীর জলে: বাংলাদেশ’। ‘সন্ধ্যানদীর জলে’ বইটি মূলত বাংলাদেশ প্রসঙ্গেই নানান সময়ে লেখা তাঁর স্মৃতিকথা, ভ্রমণপঞ্জি ও অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণময় লেখাগুচ্ছের সংকলন। ‘একুশে, একাত্তর ও নববর্ষ’, ‘ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান’, ‘গানের ভিতর দিয়ে’, ‘শিক্ষা আন্দোলন’ ও ‘স্মৃতি, ভ্রমণ’—এই পাঁচটি পর্বে বিভক্ত হয়েছে বইটি।


দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে একাধিক সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন শঙ্খ ঘোষ। ১৯৭৭ সালে ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থটির জন্য তিনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান। ১৯৯৯ সালে কন্নড় ভাষা থেকে বাংলায় ‘রক্তকল্যাণ’ নাটকটি অনুবাদ করেও সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া রবীন্দ্র পুরস্কার, সরস্বতী সম্মান, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯৯ সালে বিশ্বভারতীর দ্বারা দেশিকোত্তম সম্মানে এবং ২০১১ সালে ভারত সরকারের পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত হন শঙ্খ ঘোষ।

আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় কলকাতার নিজের বাসায় ৮৯ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। এমনিতেই বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন কবি। কয়েক মাস ধরে নানা শারীরিক নানা সমস্যায় কাতর ছিলেন। গত ২১ জানুয়ারি অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালেও ছিলেন কয়েক দিন। বাসায় ফিরে চিকিৎসার মধ্যেই ছিলেন। এই আবহে কিছুদিন আগে জ্বর আসে শঙ্খ ঘোষের। সঙ্গে পেটের সমস্যা দেখা দেয়। এরপর তাঁর করোনা টেস্ট করা হয়। ১৪ এপ্রিল বিকেলে রিপোর্ট এলে জানা যায়, তিনি সংক্রমিত হয়েছেন। তাই কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়ার পর ঝুঁকি না নিয়ে বাড়িতেই আইসোলেশনে ছিলেন। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। ক্রমেই তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমছিল। একসময় তাঁকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে চলে গেলেন কবি। 


ভয়ংকর এই মহামারী করোনা ভাইরাস বাংলা সাহিত্য জগতের আকাশ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উজ্জ্বল নক্ষত্র কে খসিয়ে বাংলা সাহিত্য কে অসহায় করে ফেলছেন….করোনার কারণে সৃষ্ট এই শূন্য স্থান কখনো পূর্ণ হবার নয় !


সামিউল হক (নিঝুম)

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ।
রেফারেন্সঃ দৈনিক প্রথম আলো ।

আরো পড়ুন

হুমায়ুন ফরিদী বাংলাদেশের অভিনয় জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র

I am the Admin Of Jibhai.com and also part of jibhai.com

Leave a Comment