এসিড বৃষ্টি কেন হয়

এসিড বৃষ্টি কি?

 এসিড বৃষ্টি যেটি অম্ল বৃষ্টি নামেও পরিচিত। এসিড বৃষ্টি হলো একধরণের বৃষ্টিপাত যেই বৃষ্টিপাতে পানি অম্লীয় প্রকৃতির হয়। এক্ষেত্রে পানির পি.এইচ ৭ এরচেয়ে কম হয়ে থাকে যে বিষয় টা সম্পূর্ণভাবে অস্বাভাবিক । এই বৃষ্টির পানির পি.এইচ মান ৭ এর কম থাকায় এই বৃষ্টিতে এসিড উপস্থিত থাকে।

এসিড বৃষ্টি ১৯৫০ সালের দিকে প্রথম দেখা যায় এবং এই এসিড বৃষ্টি দেখা যায় পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার পূর্ব দিকে। কিন্তু এই এসিড বৃষ্টি এখন  এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিন আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াতেও দেখতেপাওয়া যায়। এই এসিড / অম্লবৃষ্টি নিয়ে সর্ব প্রথম ধারণা দেয় বিখ্যাত স্কটিশ রসায়নবিদ এবং গবেষক  রবার্ট অ্যাঙ্গুস স্মিথ।১৮৭২ সালে তার বিখ্যাত বই Air and Rain: The Beginnings of a Chemical Climatology তে তিনি এসিড বৃষ্টি নিয়ে আলোচনা করেন।

নানারকম অম্লধর্মীয় অক্সাইড বা এসিড মিশ্রিত থাকার কারণে এসিড বৃষ্টির সৃষ্টি হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৃষ্টির পানির pH ৫.৬ এরসমান বা কম হয়ে থাকে। এই বৃষ্টির ফলে গাছপালা, পশু-পাখি, জলজপ্রাণী,  জীব-জন্তু,  দালান-কোঠা মারাত্মকভাবে  ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নানা ধরনের কল-কারখানা থেকে নির্গত সালফার-ডাই-অক্সাইড (SO2), সালফার-ট্রাই-অক্সাইড(NO3),  নাইট্রোজেন-ডাই-অক্সাইড (NO2) সহ আরও নানা ধরনের বিষাক্ত গ্যাস যা জীবের জন্য ক্ষতিকারক সে সকল গ্যাস  বাতাসের জলীয় বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে এসিড বৃষ্টির সৃষ্টি করে।

এসিড বৃষ্টিরহাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করার উদ্দেশ্য বিভিন্ন দেশের  সরকার ১৯৭০ সালের দিকে কারখানা থেকে এইসব গ্যাসেরনির্গমণ রোধ করতে বিভিন্ন  ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। শুধুমাত্র কল-কারখানা থেকেই নয় বরং বিভিন্নপ্রাকৃতিক কারণেও (যেমন বজ্রপাত, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, বনে আগুন ইত্যাদি) এসিড  বৃষ্টির সৃষ্টি হয়। এজন্য বর্তমানসময়ে  এসিড বৃষ্টি ভয়ংকর সমস্যার রূপ ধারণ করে  দাড়িয়েছে। এবং এই এসিড বৃষ্টি শুধুমাত্র আমাদের পৃথিবীতে হয়না বরং এটিশুক্র গ্রহেও হয়ে থাকে প্রবলভাবে।

এসিডবৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাব

এসিড বৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাব

এসিড বৃষ্টি আমাদের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক এসিড বৃষ্টি মাটির পি এইচ এরমান কমিয়ে দিয়ে মাটিকে দুর্বল এবং অম্লীয় করে তুলে। এর ফলে  মাটিতে উপস্থিত থাকা নানা অণুজীব এবং  মাটির মধ্যে বিদ্যমান নানা উদ্ভিদ এরজন্য জীবন ধারণ অনেক অসাধ্যকর হয়ে উঠে। আরএতে করে আমাদের পরিবেশেরভারসাম্যই শুধু নষ্ট হয়না বরং কৃষকের অনেক ক্ষতির শিকার হতে হয়। 

এই ক্ষতিকর এসিড বৃষ্টি গাছপালার পাতা হলুদ করে ফেলে। এমনকি এই বৃষ্টি পুকুর এবং নদীতে পড়ে পানির পিএইচ কমিয়ে দেয় যার ফলে  জলাশয়ের বসবাসকারী  নানা উদ্ভিদ ও প্রানিকুল এবং মাছের মৃত্যুর কারন হয়ে দাড়ায়। এসিড বৃষ্টি  পশু পাখির ত্বকের ক্ষতি করে, দালান-কোঠার রং নষ্ট করে বিবর্ণ করে।

এই এসিড বৃষ্টি মানুষের জন্য ও ক্ষতিকারক। এটি দেহের উপর পরলে তা মানুষের ত্বকের কোষের ক্ষতি তৈরি করে এবং অনেক সময় ক্যান্সার নামক রোগের সৃষ্টি করে। এসিড বৃষ্টির ফলে বন- জঙ্গলের অনেক গাছপালা ধ্বংস হয়ে যায়। যা পরিবেশের ওপর অনেক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এমনকি এই এসিড বৃষ্টির ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন এর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে থাকে।

বন-জঙ্গল এর উপর এরতীব্র ক্ষতিকর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কেননা এর ফলে বড় বড় বনের ভিতরের অসংখ্য গাছ-পালা ধংশ হয়ে যায়, আর এতে করেতা পৃথিবীর বনাঞ্চলের উপর বড় ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে থাকে।

পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য তাজমহলের নিকটের অনেক কারখানা সরিয়েফেলা হয়। কারণ কারখানাগুলিথেকে নির্গত গ্যাসের কারণে এসিড বৃষ্টি হতো ওই এলাকায় যাতে করে তাজমহলেরবর্ণ পরিবর্তন হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিলো।

বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন এর উপর এই ক্ষতিকর এসিড বৃষ্টির মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায়।

এসিডবৃষ্টি বা অম্ল বৃষ্টিসৃষ্টির প্রধানত দু ধরনের কারণ

১. মানবসৃষ্ট কারন

এসিড বৃষ্টির মানব সৃষ্ট কারণ

সালফিউরিক এসিড প্রায় প্রতিটি শিল্প কল-কারখানার জন্য সবচেয়ে বেশি মাত্রায়  ব্যাবহার করা রাসায়নিক বস্তুর মধ্যে অন্যতম। এজন্য বিভিন্ন কলকারখানা থেকে তাই সালফারডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয় যা অত্যন্ত ক্ষতিকারক গ্যাস । এই সালফারডাই অক্সাইড (SO2) গ্যাস বাতাসের অক্সিজেন এর সাথে বিক্রিয়া করে  জারিত হয় যার ফলে সালফার ট্রাই অক্সাইড (SO3) গ্যাস উৎপন্ন করে। আবার সকল  যানবাহন থেকে নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড (NO2) গ্যাস নির্গত হয়। এছাড়াও মানুষ অনেক রকমের বিষাক্ত জ্বালানী পোড়ানোর ফলে ও সেইসব বিষাক্ত জ্বালানী শ্বসন প্রক্রিয়া (শ্বাস-প্রশ্বাস) থেকে বায়ুমন্ডলে কার্বনডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়ে থাকে যা বায়ুমন্ডলের জন্য ক্ষতিকারক এবংএসিড বৃষ্টি হওয়ার মূল কারন। 

N2 + O2 —— > 2NO; (বিদ্যুৎক্ষরণ, ৩০০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস)

2NO + O2 —— > 2NO2;

4NO2 + 2H2O + O2—— > 4HNO3

NO + O3 —— > NO2 + O2;

NO2 + NO3 —— > N2O5, N2O5 +H2O —— > 2HNO3

২. প্রাকৃতিক কারন

এসিড বৃষ্টির প্রাকৃতিক কারণ

প্রাকৃতিক ভাবেই অধিকাংশ সময় এসিড বৃষ্টি হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক কারণে এসিড বৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারন হলো বজ্রপাত। এই বজ্রপাতের ফলে উচ্চ তাপমাত্রায় বাতাসে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়। এমনকি  অগ্নিগিরির অগ্নুৎ্পাতের ফলে খনিতে অবস্থিত  খনিস্থ সালফার পুড়ে সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস  (SO2) উৎপন্ন হয় এবং এইগ্যাস বায়ুমণ্ডলের সাথে যুক্ত  হয়।এছাড়াও  গ্রীষ্মের শুষ্কতার জন্য অনেক সময় দাবানলের সৃষ্টি হয় এবং এই  দাবানলের কারণে বনাঞ্চলে অগ্নুৎ্পাতের কারণে বিপুল পরিমাণে কার্বনডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয় এবং এইগ্যাস বায়ুমন্ডলে চলে আসে। এইসব গ্যাস বায়ুমন্ডলে অবস্থান  করতে থাকে। যেসব অঞ্চলের বায়ুস্তরে এই সকল গ্যাসের পরিমান বেশি হয়ে যায়  সেইসব এলাকায় মেঘ থেকে যখন বৃষ্টির জল নেমে আসে তখন এই বৃষ্টির জল অনেক  সময় বায়ুস্তর ভেদকরে নেমে আসে এবং তখনই বায়ুমন্ডলে  রাসায়নিক বিক্রিয়ার সৃষ্টি শুরু হয়। এইসকল গ্যাসের সাথে বৃষ্টির জল মিশে যায় এবং বিক্রিয়া শুরু করে তৈরি করে লঘু এসিড এবং এই লঘু এসিড বৃষ্টির মাধ্যমে পৃথিবীতে  নেমে আসে। 

CO2 + H2O —— > H2CO3 ( লঘুকার্বনিক এসিড)

2SO2+O2 —— > 2SO3 ( 300 – 400 nm তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট আলোক রশ্মির প্রভাবে বিক্রিয়া )

SO2+O3 —— > SO3+O2, SO3+H2O —— > H2SO4

SO2+1/2 O2 + H2O —— > H2SO4 ( বায়ুর ধূলিকণা প্রভাবক হিসেবে কাজ করে )

SO2+ H2O —— > H2O3; H2SO3 + H2O —— > H2SO4+ H2

NO2 + H2O —— > HNO2 + HNO3 (লঘু নাইট্রাসও লঘু নাইট্রিক এসিড)

এসিডবৃষ্টির প্রতিকার 

এসিডবৃষ্টির প্রতিকার

এসিডবৃষ্টি আমাদের পরিবেশের জন্য মারাত্মক এবং এর ফলে  ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।  তাই এই ক্ষতিকর এসিড বৃষ্টির  প্রতিকার এর জন্য সকলকে সচেষ্ট হতে হবে এবং পদক্ষেপ নিতে হবে এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। এসিড বৃষ্টি প্রতিকারে যে পদক্ষেপগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।সেগুলোর মধ্যে- সালফারযুক্ত যেসব জ্বালানী আছে সেসকল জ্বালানী  ব্যবহারের পরিমাণ যতটা সম্ভব কম করতে হবে এবং সচেতন হতে হবে । এবংবিভিন্ন রকম  নবায়ন যোগ্য জ্বালানীর ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে। জালানি হিসেবে  প্রাকৃতিক গ্যাসই উত্তম এবং এই গ্যাস  ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইটেরভাটা থেকে যে পরিমানে  কালোধোঁয়া বের হয় সেই সকল ধোঁয়া  এই এসিড বৃষ্টি তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সুতরাংএই ইটের ভাটার কালোধোঁয়া পরিশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে।

এমনকি শিল্প কারখানার বর্জ্য গ্যাস নির্গত না করে তা রিসাইক্লিং বা পুনসঞ্চালন করারউত্তম ব্যবস্থা করতে হবে।

বর্তমানের আধুকিন এই পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত আমরা অনেক ক্ষতিকারক এবং বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করছি যার ফলে ব্যাপক হারে দূষণ হচ্ছে।সুতরাং আমাদের এই সকল গ্যাস ব্যবহারে সচেতন  হতে হবে।

তাছাড়াও আমাদের সকল সাধারণ মানুষকে অবশ্যই এই এসিড বৃষ্টির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অবগত করাতে হবে এবং  সচেতন করে তুলতে হবে যাতে করে তারা এসিড বৃষ্টি যেননা হয় তার জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের মধ্যে এই সচেতনতা পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষকরে শিল্প প্রধান সকলদেশ সমুহে এই এসিড বৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সকলকে জানাতে হবে এবং কল-কারখানাগুলোকে এ ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে যাতে করেকল-কারখানা থেকে এই ক্ষতিকর দূষিত বায়ু নির্গত হতে না পারে। 

আমাদের বেশি পরিমাণে গাছ রোপণ করতে হবে যাতে করে আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে। এর ফলেই এসিডবৃষ্টি প্রতিকার করা সম্ভব হবে।

Author:

Aritro Sarkar

Bangladesh University

Department of English

আরো পড়ুন

নিউটনের জীবনী সময়ের শ্রেষ্ট পদার্থ বিজ্ঞানী

জ্যোতির্বিজ্ঞান কি? মহাজাগতিক বিষয়ের আপনার জানা কতটুকু!!

এসিড বৃষ্টি কেন হয়

লাফিং গ্যাস কি? কৃত্তিম হাস্যরহস্য অজানা নয়

Hi, I am Sourav Das, I have been writing on Jibhai for about 1 year, this is my site, and I am a part of Jibhai. Thanks

Leave a Comment