ইহুদিদের ইতিহাস ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম

By Hossain Rakib

ইহুদি

ইহুদি হলো একটি জাতিগোষ্ঠির নাম,এরা একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীও তারা ইহুদি ধর্মের অনুসারী। যারা বনী-ইস্রায়েল জাতির অন্তর্গত।
ইব্রাহীমের পুত্র ইসহাক,এবং ইসহাকের পুত্র পুত্র ইসরাইল এর বংশধরগণ বনী-ইস্রায়েল নামে পরিচিত। ইসরাইল(ইয়াকুব) এর বারো পুত্রের নামে বনী-ইস্রায়েলের বারোটি গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে। যার মধ্যে ইয়াহুদা’র ছেলেমেয়েরা ইহুদি নামে পরিচিত।

ইহুদিদের ইতিহাস

ইহুদিদের ইতিহাস
ইহুদি জাতির ইতিহাস

ইতিহাসের পাতায় ইহুদিরা একটি দুর্ধর্ষ জাতি হিসেবে পরিচিত। তারা একটি জনগোষ্ঠী তাদের জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় বিশ্বাস এর দিক থেকে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কযুক্ত একটি জাতি গোষ্ঠী। সবচেয়ে বেশি ইহুদীরা বসবাস করে ইসরায়েল এ প্রায় ৬০৪১০০০ এবং আমেরিকায় ৫৩২৫০০০। ইহুদিরা আরো কানাডা, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ফ্রান্স, ব্রাজিল সহ নানা দেশে বসবাস করছে দীর্ঘদিন যাবত।


ইতিহাসের যেসব জাতি দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদেরকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো তাদের মাঝে ইহুদি জাতি অন্যতম। তাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তাদের দীর্ঘ জাতি সংগ্রাম সম্পর্কে জানা যায়। খ্রিস্টধর্ম যখন জনপ্রিয় ধর্ম হিসেবে বিস্তার লাভ করছিলো তখনও এই ধারণা প্রচলত ছিল যে “ইহুদীরা যীশুকে শূলে চড়াতে সাহায্য করেছে”, তাছাড়া আরো নানা রকমের ধরণা প্রচলিত ছিলো যেমন “ইহুদিরা তাদের নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছোট ছোট খ্রিস্টান বাচ্চাদের রক্ত পান করতো এবং ইহুদিরা তাদের নানা রকমের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে খ্রিস্টান বাচ্চাদের বলি দেয়। এরকম নানান কথা তখন প্রচলিত ছিলো। এসব প্রচলিত কাহিনী কারণে ইতিহাসে অনেক সময় ইহুদিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। ক্রোসেডের সময়ও দেখা যায় যে যেখানে অগণিত ইহুদি গনহত্যার হত্যার শিকার হয়েছে। এটা কেবলমাত্র সেই আমলে নয়, শত বছর আগেও যখন ইহুদিদের নির্দিষ্ট কোন দেশ ছিল না, ইহুদিরা যখন পুরো ইউরোপ অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করত তখনো ধারণা করা হত যে সমাজের নানা রকমের বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী এই সম্প্রদায়৷ হিটলার কর্তৃক ইউরোপে ইহুদিরা অবাঞ্চিত ঘোষনা হওয়ার পর প্রচুর ইহুদিকে গনহত্যার শিকার হয়েছিলো।

দ্যা হলোকাষ্ট কি ?

ইহুদি হলোকাষ্ট মনোম্যান্ট বার্লিন জার্মানি
হলোকাষ্ট মনোম্যান্ট, বার্লিন, জার্মানি

ইহুদি জাতি অনেকবার গণহত্যার শিকার হলেও সবচেয়ে বড় ইহুদি গনহত্যার নাম দ্যা হলোকাষ্ট। হিটলারের নাৎসি বাহিনী কতৃক ইউরোপে ইহুদিরা অবাঞ্ছিত ঘোষনা হওয়ার পর প্রায় ৭০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছিলো। যা ইতিহাসের নির্মম গণহত্যার মাঝে অন্যতম। ইহুদিদের হত্যার ধরণ ছিলো কাউকে সরাসরি হত্য করা আবার কাউকে বন্দি শিবিরে নিয়ে হত্যা করা।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম

ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম
ইসরায়েল রাষ্ট্রের পতাকা

ফিলিস্তিনে ইহুদি মাইগ্রেশন ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম

১৮৮১ সালের দিকে ব্যাপক হারে ইহুদিদের ফিলিস্তিন অভিমুখে যাত্রা করতে দেখা যায় । তারা সে সময়ে দলে দলে ফিলিস্তিনের দিকে যাত্রা করে। সে সময়ে ফিলিস্তিন আলাদা রাষ্ট্র ছিল না। এটা ছিল অটোমান সম্রাজ্যেরের অধীনে শাসিত অঞ্চল।

ইহুদি জাতি ফিলিস্তিনে যাওয়ার কারণ

ইহুদি জাতি ফিলিস্থিনে যাওয়ার কারণ
Jerusalem


ইহুদিদের এভাবে ফিলিস্তিন অভিমুখে যাত্রার কিছু কারণ ছিলো


সে সময়ে অটোমান সাম্রাজ্যে, ইহুদিরা, মুসলমানরা, খ্রিস্টানরা আরো অন্য ধর্মের মানুষেরা তারা সকলেই অনেকটাই শান্তিপ্রিয়ভাবে একসাথে বসবাস করত।
জেরুজালেম হল ইহুদিদের জন্য পবিত্র ভূমি,জেরুজালেমের সেটির অবস্থান ফিলিস্তিনে।
এসকল কারণে তখন ইহুদিরা ব্যাপর হারে ফিলিস্তিন অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।

১৯৪০ এর পরবর্তী সময়ে। এডলফ হিটলার কর্তৃক ইউরোপের ইহুদি নিধনের শপথ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে, হিটলার আগে থেকেই ইহুদী বিদ্বেষী ছিলো। ২য় বিশ্বযুদ্ধে চলাকালীন তার সেনাবাহিনীর হাতে প্রায় ৬ মিলিয়ন ইহুদী মারা গিয়েছিলো। হিটলারের নির্যাতনে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এসে ইহুদিরা আবার মাইগ্রেশন শুরু করে যার বিশাল একটা সংখ্যা আবারো ফিলিস্তিনের দিকেই আসে।

তখন ফিলিস্তিন বৃটেনের অধিকারে ছিলো। প্রথম দিকে বৃটেন ইহুদিদের ফিলিস্তিনের ঢুকতে দিলেও এক পর্যায়ে এসে ফিলিস্তিনে ঢুকতে তারা বাধাগ্রস্ত হয়। তখন থেকেই ফিলিস্তিনের ইহুদিদের মাঝে এক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় জাতীয়তাবাদের সূচনা ঘটে এবং তারা নিজেদের আলাদা রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করতে থাকে।


১৯৪৮ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন ভাগ না করে দিয়ে তারা ফিলিস্তিন ত্যাগ করে। তারা ফিলিস্তিন ভাগের দায়িত্ব দেয় জাতিসংঘকে। জাতিসংঘই সেসময়ে ফিলিস্তিনকে দুই ভাগ করে দুটি দেশ করে দেয়। ৫৫ শতাংশ দেওয়া হয় ইহুদিদের, ৪৫ শতাংশ দেওয়া হয় ফিলিস্তিনের। এবং তারা এটাও বলে যে যেহেতু জেরুজালেম , খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলমান তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র ভূমি হিসেবে পরিচিত তাই জেরুজালেমের ক্ষমতা দুই দেশের কারো কাছেই থাকবে না। এর কর্তৃত্ব থাকবে জাতিসংঘের কাছে। পরবর্তীতে ইহুদিরা জাতসংঘের এই প্রস্তাব মেনে নেয়। ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে দেশের নাম ইসরাইল রেখে নিজেদের দেশের যাত্রা শুরু করে। এভাবেই তৈরি হয় ইসরাইল নামক দেশের।

প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ

ইহুদিরা জাতিসংঘের প্রস্তাব মেনে নিয়ে রাষ্ট্র গঠন করলেও ফিলিস্তিনের আশেপাশের আরব রাষ্ট্র জাতিসংঘের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং ১৯৪৮ সালে মাত্র একদিন বয়সী রাষ্ট্র ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে জর্ডান, মিশর সিরিয়া এবং ইরাক পরবর্তীতে তাদের সাথে যোগ দেয় সৌদি আরব, ইয়েমেন, মরক্কো, সুদান। ইহুদীরা তাদের সমগ্র শক্তি দিয়ে লড়ে যায়। পরের ঘটনা সবার জানা পৃথিবীকে আশ্চর্য করে দিয়ে সদ্য জন্ম নেয়া একটা দেশ শক্তিশালী ৮ টি দেশের বিরুদ্ধে লড়েও যুদ্ধে জয়ী হয়ে যায়। এই যুদ্ধ প্রায় এক বছর যাবৎ স্থায়ী ছিলো। ইহুদিদেরএই যুদ্ধে তেমন কোন ক্ষতি না হলেও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফিলিস্তিনিরা। যুদ্ধের পরবর্তীতে দেখা গেল যে, যে দেশটা ফিলিস্তিন হবার কথা ছিল সেটা ছিল দুটো অঞ্চলের সমন্বয়ে। একটা পশ্চিম তীর অন্যটা গাজা স্ট্রিপ। যুদ্ধের পরবর্তীতে দেখা যায় গাজা স্ট্রিপের কর্তৃত্ব চলে যায় মিশরের হাতে আর পশ্চিম তীর দখল করে নেয় জর্ডান। যার অর্থ এই দাঁড়ায় যে ফিলিস্তিনের নামক দেশের আর কোনো অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকেনা। তারা তাদরে নিজেদের ভূমি মিশর ও জর্ডানের কাছে হারিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফিলিস্তিনি বিভিন্ন আরব দেশে শরনার্থী হয়েছিলো।

দ্বিতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ

১৯৬৭ সালে আশেপাশের বাকি আরব দেশগুলোর সাথে আবার ইজরায়েলের যুদ্ধ বাধে। যা ইতিহাসের পাতায় দ্বিতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ নামেই পরিচিত। এই যুদ্ধ মাত্র ৬ দিন স্থায়ী হয়েছিলো মাত্র এই যুদ্ধ মিশর, জর্ডান, সিরিয়ার লজ্জাজননক হার ঘটে এই যুদ্ধেও ইসরাইলে জয়ী হয়। আরব রাষ্ট্র গুলো কেবল যুদ্ধে পরাজিতই হয় না বরং ইসরাইল এবার জর্ডানের কর্তৃত্বে থাকা পশ্চিম তীর এবং মিশরের কর্তৃত্বপ থাকা গাজা স্ট্রিপ দখল করে নেয়। সাথে তারা মিশরের নিজস্ব ভূমি সিনাই পেনিনসুলাও দখল করে নেয়। সিরিয়া থেকে দখল করে সিরিয়ার গোলান হাইটস।

ইসরাইল-মিশর শান্তি চুক্তি

ইসরাইল ও মিশরের মাঝে শান্তি চুক্তি সাক্ষরিত হয়
১৯৭৮ সালে।এই চুক্তির মাধ্যমক মিশর প্রথম কোনো আরব দেশ যারা ইসরাইলকে রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়। এই চুক্তির কারণে ইসরাইল প্রায় দশ বছর ধরে দখল করে রাখা মিশরের সিনাই পেনিনসুলা ফিরিয়ে দেয়। এই শান্তি চুক্তির কারনে ১৮৭৮ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাশ্যাম বেগিম এবং মিশরের রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাতকে নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। এই চুক্তির কারণে আনোয়ার সাদাত মুসলিম বিশ্বের কাছে নিন্দিত ব্যক্তি হিসেবে পরিণত হয়। মুসলিম বিশ্ব এই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে। এই চুক্তির কারণে মিশরের সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করে।

ইসরায়েলে ও ফিলিস্তিনিদের মাঝে এখনো রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছে। হামাস এখনো ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে যাচ্ছে হামাস হলো ফিলিস্তিনের একটি ইসলামি রাজনৈতিক দল, হামাস গাজা শহর নিয়ন্ত্রণ করে।এভাবে নানা ঘাতপ্রতিঘাত, যুদ্ধ, সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ইহুদিরা ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করেছে। এবং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাত এখনো চলমান

আরো পড়ুন

Leave a Comment