আমার মুক্তিসংগ্রাম বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আবদুল হক

বই রিভিউ আমার মুক্তিসংগ্রাম

লেখক মোঃ আবদুল হক

আমার মুক্তি সংগ্রাম বই রিভিউ

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। আর মুক্তিযোদ্ধারা সেই অহংকারের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭১ এ যারা দেশমাতৃকার ডাকে ছুটে গিয়েছিলো মরণপণ যুদ্ধে তাদের ঋণ অপূরণীয়। এমনি এক মুক্তিযোদ্ধা মো: আবদুল হক। মো: আবদুল হকের বয়স ছিলো মাত্র ১৯ বছর যখন তিনি যুদ্ধে যান। কিশোরগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এই বীর। পাঁচটি সমর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ‘আমার মুক্তিসংগ্রাম ‘  তাঁর লেখা প্রথম গ্রন্থ।বইটিতে তিনি তাঁর যুদ্ধ যাত্রা থেকে শুরু করে কিভাবে তিনি ভারতে ট্রেনিং এর যান, কিভাবে দেশে ফিরেন,  কিভাবে সমর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, কিভাবে রাজাকার দের ধরাশায়ী করেন, মুক্তিযোদ্ধাদের চাওয়া পাওয়া ইত্যাদি তুলে ধরেছেন। ১৫৮ পৃষ্ঠার এই বইটিতে তিনি স্মৃতিচারণ ও করেছেন,  তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও তুলে ধরেছেন বইটিতে, উঁনার সহযোদ্ধাদের কথাও স্মরণ করেছেন। পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও অনেক আশা ব্যক্ত করেছেন এই যোদ্ধা৷    

বইটির প্রথমেই লেখকের জন্মস্থান কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার পরিচয় দিয়েছেন। অষ্টগ্রাম উপজেলার সাথে নদী পথ ছাড়া অন্যকোনো যোগাযোগ নাই। এই উপজেলায় ছয় মাস শুধু পানিই থাকে। আর ছয় মাস শুকনা। অর্থাৎ এখানে দুইটা ঋতু। গ্রীষ্ম আর বর্ষা। তখনকার সময়ে বিদ্যুৎ ছিলো না। মানুষজন পানিতে মাছ ধরেই জীবীকা বহন করতো। শুকনো মৌসুমে ধান চাষ করতো। তার পর লেখক ভারত যাত্রার কথা বর্ণনা  করেন। লেখক তার কয়েকজন বন্ধু এবং পরিচিত কয়জন কে নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তখন টাকার জন্য লেখক তাঁর ঘড়ি টি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। লেখকের মা ছিলেন বিধবা।বিধবা মা কে ছেড়ে যেতে লেখকের কষ্ট হলেও দেশমাতার কথা ভেবে লেখক চলেই যান ভারত ট্রেনিং এর জন্য। ভারতে যাবার পথ না চেনায় লেখক এক দালাল এর সঙ্গে পরিচিত হন যিনি বিশ টাকার বিনিময়ে লেখক ও তার সঙ্গীদের কে ভারতে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেন। প্রথমে লেখকের ঐ দালালের প্রতি রাগ থাকলেও পরে লেখক ঐ দালাল কে স্যালুট জানান কারণ ফেরার পথে ঐ দালাল নিহত হন  পাকিস্তানী আর বাঙালি মুক্তিযুদ্ধাদের অপারেশনে। লেখক তাঁকেও শহীদ হিসেবে গণ্য করেন। তারপরে লেখকের শুরু হয় ভারতের ট্রেনিং। খুব কষ্টকর ছিলো ট্রেনিং এর দিন গুলো। সারাদিন পিটি করতো যোদ্ধারা। দু’বেলা ভাত খেতে দিতো। বিভিন্ন অস্র চালানো শেখানো হতো। একদম যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা তোলা হচ্ছিলো । সারাদিন পরিশ্রম শেষে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়তো। হঠাৎ করে তাদের কে আদেশ করা হতো রাউন্ড দেওয়ার জন্য যাতে যেকোন সময় তারা প্রস্তুত থাকতে পারে। রাতে অবসরে তারা দেশাত্নক গান শুনতো, দেশের তরে আরো প্রেম জেগে উঠছিলো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতো এবং বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার বীর হিসেবে মনে করেন মুক্তিযোদ্ধরা। তার পর ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরলেন। খুব গোপনীয় ভাবে প্রবেশ করলেন কারণ রাজাকার রা টের পেলেই মেরে ফেলবে।বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন।এমনও হয়েছে কিছু না খেয়ে মরে যাবার মতো অবস্থা। তখন পাশের ই কোন গরিব মা ভাত পাঠিয়ে দিয়েছে। তখন লেখকের নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে। একবার  লেখক ট্রেনে করে কোথাও যাচ্ছিলো তখন এক পাকিস্তানী এসে ট্রেনের পাঁচজনের সিটে একা বসে এক বাঙালিকে বলে তাকে হাত পাখা করে বাতাস দিতে। বাঙালি ঐ লোকটা একটু হাত পাখা থামিয়ে নিলে পাকিস্তানী ঐ লোকটি বাঙালি লোকটাকে আঘাত করে নিজ হাতে। তখন লেখকের মনে জেগে উঠেছিলো প্রশ্ন শুধু মাত্র পাকিস্তানী হওয়ায় তাদের এতো অত্যাচার সহ্য করতে হয়। আমরা বাঙালি এটাই আমাদের দোষ? 

লেখক পাঁচটি সমর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। বগামারা পুলের যুদ্ধ, নিকলীর যুদ্ধ, বাজিতপুরের যুদ্ধ, অষ্ট্রগ্রামের তিনটা যুদ্ধ, সাভিয়ানগর বাজার ক্যাম্পের যুদ্ধ। অপারেশন গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আপনাকে পড়তে হবে বইটি ” আমার মুক্তিসংগ্রাম ”

লেখক তার অপারেশন গুলো বর্ণণার পরে রাজাকার দের কে দিয়ে বলেছেন তার মতামত।রাজাকার দের কে তারা শাস্তি দিতো। এক রাজাকার কে তিনি মাফ করে দিয়েছিলেন যে রাজাকার তার বাবার হত্যাকারী। কিন্তু তিনি বঙ্গবন্ধুর আর্দশে ছিলেন অনুপ্রাণীত। ব্যাক্তিগত ক্রোশ তিনি এখানে দেখান নি। 

লেখকের  বইটির শেষে  হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তেমন অবগত নয়। প্রকৃত ইতিহাস তারা জানে না। তিনি চান প্রকৃত ইতিহাস যেনো পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে। সকলে যেনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের  কে যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় নি বলে তিনি মনে করেন।এখনো অনেক মুক্তিযোদ্ধা অপুষ্টিতে ভোগে।তিনি সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ কামনা করেন। বই, পুস্তকে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান করেন। সব চাকরিতে ৩০% মুক্তিযোদ্ধা কোটা দাবী করেন। তিনি বইটিতে বলেন মুক্তিযোদ্ধারা না থাকলে দেশ স্বাধীন হতো না, আজীবন পরাধীন থাকতে হতো, তাই মুক্তিযোদ্ধা কোটা – এটা প্রাপ্য অধিকার। 

বইটির শেষে তিনি তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোকপাত করেন। পাঁচ সন্তানের জনক তিনি। ছেলে মেয়ে সবাই প্রতিষ্ঠিত। উনার অষ্টগ্রাম উপজেলার যতো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তাদের একটা তালিকা তিনি দিয়েছেন। বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাত কার ও তিনি বইটিতে দিয়েছেন। বইটিতে তিনি সুন্দর করে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট আবদুল হামিদ কে। 

স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাস এইচ এম শামসুর রহমান

সূর্য দীঘল বাড়ি আবু ইসহাক

বইটির মূল্য – ৩৫০ টাকা মাত্র 

সাদিয়া আফরিন 

শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

Leave a Comment