আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের (নিলয়): ক্যাম্পাসকে নিজের মতো করে ভালোবাসতে হবে

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক সীমাবদ্ধতা আছে সত্য। আবাসনে সমস্যা, খাবারের মানে সমস্যা, যাতায়াতে সমস্যা ; অনেক সমস্যা আমাদের। এগুলো মেনে নিয়ে সমস্যাগুলো নিজের জায়গা থেকেও সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে যতটুকু পারা যায়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী-কর্মকর্তা সবার কন্ট্রিবিউশান নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়।  মায়ের প্রতি দায়িত্ব যেমন জোষ্ঠ সন্তান পরিপূর্ণ করতে না পারলেও বাকি সন্তানেরা এড়িয়ে যেতে পারে না, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেবার কাছে কোনো গোষ্ঠী তার দায়িত্ব পালন না করতে পারলে ছাত্রদেরও দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া উচিত না।


বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গে এ কথাগুলোই বলছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের (নিলয়)। জ্বি ভাই এর আজকের ফিচার তার সব কর্মকান্ড নিয়েই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের 

মোঃ আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের যাকে ক্যাম্পাসে তার কাছের মানুষরা আল জোবায়ের নিলয় বা নিলয় নামে ডাকেন তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের একজন শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসে নিলয় পরিচিত ছাত্রকল্যাণে কাজ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সেবা, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা, ছাত্ররাজনীতি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও বিতর্কচর্চার মাধ্যমে। 

ক্যাম্পাস নিয়ে আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের এর কর্মকাণ্ড

 
আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের (নিলয়) মূলত ছাত্রঅধিকার ও নান্দনিক ক্যাম্পাস তৈরির জন্য কাজ করছেন। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে আর্থিক সংকটের সময়ে মেস ও কটেজভাড়া কমানোর দাবির অন্যতম সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নিলয়। তাদের দাবির মুখেই কটেজে ৪০% ভাড়া মওকুফের নোটিশ প্রদান করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যে সমস্ত বাড়িওয়ালা এ সিদ্ধান্ত মেনে নেননি তাদের সাথে আলোচনা করে নোটিশ বাস্তবায়নেও কাজ করেন নিলয় ও তার বন্ধুরা। কয়েকহাজার শিক্ষার্থীর আবাসন সমস্যা দূর হয় এতে। বন্ধ ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কটেজ ও বাসায় চুরির ঘটনায়ও অবস্থান নেন তারা। চবি সাউথ ক্যাম্পাসের একাধিক বাসায় চুরির ঘটনায় তাদের সংগঠন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা সংসদ  এর পক্ষ থেকে তারা ব্যবস্থা নেন এবং ক্ষতিপূরণ ও আদায় করেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর শ্লীলতাহানির ঘটনায় দায়ী বাসটি আটকিয়েও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেন তারা। টিউশন মিডিয়ার নামে শিক্ষার্থীদের টাকা আত্মসাৎকারী মিডিয়াকে ধরে টাকা আদায়ও করেছেন তারা। এছাড়া নান্দনিক ক্যাম্পাস নিশ্চিত করবার জন্য নিয়মিত পরিচ্ছন্ন অভিযান, শহীদ মিনার পরিষ্কার করে তার ভেতর পদ্মগুল্ম লাগানোর ব্যবস্থাও করেন তারা।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নিলয় বলেন, “কোনো কাজই একলা করা যায় না। আলহামদুলিল্লাহ অনেকেই চায় ক্যাম্পাসটা সুন্দর থাকুক। শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত হোক। আমার বন্ধুবান্ধব ও জুনিয়রদের যখনই কোনো কাজে ডাক দিয়েছি সবসময়ই সাথে পেয়েছি। একইভাবে যখন ওরা ডাক দিয়েছে ওদের সাথে যোগ দেবার চেষ্টা করেছি। এগুলো সবই টিম ওয়ার্ক, আমার একলার না।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা সংসদ 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা সংসদ আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের (নিলয়) ও তার বন্ধুদের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যেটি পাশে দাঁড়িয়েছে চবির অসংখ্য শিক্ষার্থীর। এই সংগঠনের ব্যানারেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকারে কাজ করেন তারা। নিলয় জানান, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা সংসদের ক্রেডিটটা এর প্রতিষ্ঠাতাদেরই আগে যায়। আমার বন্ধু-বান্ধবীরা- তাইব, শান্ত, তানজিল, ফারাবী, বাবু, নওশিন, নিশাত, বিল্লাহ ওদের উদ্যোগ এটা। মূলত তাইবের উদ্যোগেই আমরা প্রথম এক হই যে আমাদের স্টুডেন্টদের জন্য কিছু করা দরকার। এরপর ১৮-১৯ সেশনই এটার পিছনে কাজ শুরু করে আর সবার সমর্থনও আমরা পেতে থাকি। শিক্ষকরাও আমাদের অনেক সহায়তা করেছেন ও সমর্থন দিয়েছেন।”

চবির শহীদ মিনারে ফুটবে পদ্মফুল

নিলয় ও তার বন্ধুরা চবির শহীদ মিনারের ভেতরের ফোয়ারার অংশে গিয়ে দেখেন এটি আবর্জনায় পরিপূর্ণ। পাঁচজন মিলেই পুরো শহীদমিনার পরিষ্কার করে পানির ময়লা সরিয়ে তাতে প্রতীকি প্রতিবাদ হিসেবে লাগিয়ে দেন পদ্মগুল্ম। এরপরও ময়লা ফেলতে থাকবার পরও তারা সেগুলো পরিষ্কার কার্যক্রম চালিয়ে যান। এখন সেই ফোয়ারায় সগর্বে জেগে উঠেছে তাজা পদ্মগুল্ম। হয়তো অতিদ্রুত চবির শহীদ মিনারে শোভা পাবে পদ্মফুল।নিলয় জানান,তাদের দেখাদেখি অনেকেই এ পরিচ্ছন্ন অভিযানে যোগ দিয়েছেন। শহীদ মিনার আগের মতো নোংরা হয় না এত। 

চবির একটি বটতলা তৈরির উদ্যোগ


আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের (নিলয়) ও তার বন্ধুরা মিলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সুন্দর বটতলা সৃষ্টির প্রয়াস ও তৈরী করেছেন। চাকসুর অপরদিকে একটি ভালো জাতের বটগাছ লাগিয়েছেন তারা যেটা ভবিষ্যতে হয়তো হয়ে উঠবে চবির বটতলা। নিলয় বলেন, “বটগাছের কাহিনীটা ইন্টারেস্টিং।  মাস্টার্সের এক সিনিয়র একদিন বলেন ক্যাম্পাসে কোনো সুন্দর বটগাছ নেই। এটা তখনই মাথায় ঢুকে যায়৷ আমরা তখন পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে দেখি আসলেই এটা সত্যি এবং আমরা কেউ খেয়ালও করিনি। তখনই নওশিন-আশিকের জাগরণ নামের প্রজেক্টটাকে প্রস্তাব দেই একটা বটতলা হোক আমাদের। ২১এ ফেব্রুয়ারিতে জাগরণের শুভ উন্মোচনে চাকসুর অপরদিকে এ বটগাছটি লাগিয়ে এটি উদ্বোধন করেন চবির রেজিস্ট্রার মোঃ মনির স্যার। সেখানে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও প্রক্টর প্যানেলের শিক্ষকরাও উপস্থিত ছিলেন।”চাকসুর অপজিটেই কেন, এ প্রশ্নের জবাবে নিলয় বলেন, “চাকসুটাই তো সব। ৩১ বছর ধরে নির্বাচন নেই কিন্তু ঐ চাকসুই আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার বুঝিয়ে দেবার মতো একমাত্র যোগ্য ইন্সটিটিউটশন। বটতলাটা এখানেই হলে একদিন হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা, সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখানে বসে তাদের অধিকার নিয়ে ডিসকোর্সে মেতে উঠবে।

ছাত্ররাজনীতিতে আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের 


চবি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত আছেন আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের (নিলয়)। জ্বি ভাই কে জানান, তিনি বিশ্বাস করেন ছাত্ররাজনীতি অধিকার আদায়ের চাবিকাঠি। আদর্শভিত্তিক ছাত্ররাজনীতিই কেবল পারে ছাত্রঅধিকার সমুন্নত করতে।

বিতার্কিক আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের 

আলাওল হল বিতর্ক সংসদ
আলাওল হল বিতর্ক সংসদ


আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের বিতর্কচর্চায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাইরে অন্যতম পরিচিতমুখ। চিটাগং ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির বিতার্কিক হিসেবে বিতর্কচর্চা করেন তিনি। এছাড়া মহাকবি আলাওল হল বিতর্ক সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। নিজের বিভাগ লোকপ্রশাসনের নিজস্ব বিতর্ক সংগঠন পিএডিএফ-সিইউ এর সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও বর্তমানে দায়িত্বরত আছেন তিনি। 

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের 

মূকাভিনয়ে নিলয় আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের
মূকাভিনয়ে নিলয়

মঞ্চনাটক ভালোবাসেন নিলয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগে চান্স পান তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যসংসদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই মঞ্চের প্রতি আগ্রহ থেকে সেখানে বেশ কিছু কাজ করেন এবং পরে চবিতে চলে আসার পরও এখানে মঞ্চনাটক নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি মূকাভিনয়ে আগ্রহের জায়গা থেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন চিটাগং ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশন। 


এত সংগঠনে নিজের সংপৃক্ততার কারণ জিজ্ঞাসা করলে আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের (নিলয়) জানান, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় একটু শহর থেকে দূরে হওয়ায় এবং আরো কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে বেশ পিছিয়ে আছে। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ছাড়া এটা উত্তরণের উপায় নেই। তাই যত সংগঠনে নিজেকে যুক্ত রেখে সবাইকে সেবা দেয়া যায় তার চেষ্টা করি৷ আর নতুন সংগঠনগুলোকে উঠে আসতে সাহায্য করবার চেষ্টা করি সবাই মিলে একসাথে। 

থার্ড আই- মানবতার আরেক নাম

জাতীয় দৈনিক সমকালে থার্ড আই নিয়ে ফিচার
জাতীয় দৈনিক সমকালে থার্ড আই নিয়ে ফিচার

থার্ড আই নামে একটি সামাজিক সংগঠনের হেড অব হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং এর দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের (নিলয়)। এই সংগঠনের মাধ্যমে তারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিয়ে দেয়া, বই রেকর্ড করে দেয়া, ডেভলপমেন্ট ট্রেনিং সহ নানা সহায়তা করে থাকেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় দেখতে চান নিলয়? জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে অনেক গর্ব করার মতো অবস্থানে। কিন্তু একটা একদিনে হবে না। একজনে করতে পারবে না। আমাদের গবেষণায় আরো প্রণোদনা প্রয়োজন, আবাসন সমস্যা দূর হওয়া প্রয়োজন, যাতায়াত সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন, শিক্ষার্থীদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। অনেক কিছুই দরকার। সব একসাথে হবেনা জানি তার সেজন্য যতটুকু সম্ভব ক্যাম্পাসকে দেবার চেষ্টা করি৷ নিজেকে যেমন আমরা ভালো রাখতে চাই, ক্যাম্পাসকেও তেমনি চেষ্টা করতে হবে। ক্যাম্পাসকে নিজের মতো ভালোবাসতে হবে।

I am the Admin Of Jibhai.com and also part of jibhai.com

Leave a Comment