অম্ল ও ক্ষারক

By Aritro Sarkar

অম্ল ও ক্ষারক

অম্ল বা এসিড হল এমন একটি অণু বা আয়ন যা প্রোটন হাইড্রোজেন আয়ন (H+)  দান করতে সক্ষম হয়, অথবা, বিকল্পভাবে, সমবায়ু গঠনে সক্ষম। 

অম্ল বা এসিড এমন  এক ধরনের  রাসায়নিক পদার্থ যেখানে এক বা একাধিক হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে এবং সেই সকল  হাইড্রোজেন পরমানু ধাতু বা যৌগমূলক দ্বারা আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে প্রতিস্থাপিত করা হয়ে থাকে । যে সকল হাইড্রোজেন  পরমানু ক্ষারকের সাথে প্রশমন বিক্রিয়া করে লবণ ও জল উৎপন্ন করে তাকে অম্ল বা এসিড বলে।অর্থাৎ এসিড ক্ষারকের সাথে প্রশমন বিক্রিয়া করে লবন এবং পানি উৎপন্ন করে।

এসিড শব্দের অর্থ টক অর্থাৎ সকল টক স্বাদযুক্ত খাবারের মধ্যে এসিড বিদ্যমান থাকে।যেমন, তেতুল,লেবু প্রভৃতি টক স্বাদযুক্ত অর্থাৎ এসকল কিছুর মধ্যে এসিড বিদ্যমান। এসিড  শব্দটির উৎপত্তি অ্যাসিডাস (Acidus) হতে, যার অর্থ টক। 

তেতুল এবং লেবু জাতীয় ফলের মধ্যে  অতি অল্প মাত্রায় এসিড (জৈব এসিড)থাকে যার ফলে এই এসিড  ক্ষতিকারক নয়। কিন্তু পরীক্ষাগারে বিভিন্ন এসিড ব্যবহার করা হয়ে থাকে  (যেমন : হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড(HCL), সালফিউরিক অ্যাসিড (H2SO4) ইত্যাদি)  এই সকল এসিড তীব্র এসিড হওয়ায় অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এই সকল এসিড  অজৈব বা খনিজ অ্যাসিড বলেও পরিচিত । 

এসিড চেনার পদ্ধতি: 

অম্ল বা এসিড চেনার পদ্ধতি

সকল প্রকার এসিডে হাইড্রোজেন আয়ন(H+)  থাকে। এটি সকল প্রকার এসিডের এসিডের একটি সাধারণ  বৈশিষ্ট্য। সকল প্রকার এসিড আর্দ্র হয়ে থাকে।  এসিড  জলীয় দ্রবণে নীল লিটমাসকে লাল করে অর্থাৎ যেসকল যৌগ জলীয় দ্রবনে নীল লিটমাসকে লাল করে সে সকল যৌগই এসিড । যেমন : হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ( HCl), সালফিউরিক অ্যাসিড ( H2SO4), নাইট্রিক এসিড (HNO3) প্রভৃতি এসিডে হাইড্রোজেন আয়ন (H+) থাকে এবং এই হাইড্রোজেন আয়ন এর মাধ্যমেই এসিড সহজে শনাক্ত করা যায়। 

নির্দেশক ও এর ব্যবহার:

যা এসিড ও ক্ষারকের সাথে যুক্ত হয়ে রং পরিবর্তন করে থাকে তাকে নির্দেশক বলে।বিভিন্ন এসিড শনাক্তকরণ এর জন্য  বিজ্ঞানাগারে   লিটমাস  কাগজ,ফেনোফথ্যালিন, মিথাইল অরেঞ্জ, ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শুধুই এই তিনটি নির্দেশক ছাড়াও জবা ফুলের রস ও নির্দেচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। 

• লিটমাস কাগজ বা দ্রবন কোন এসিড এর সাথে যুক্ত করলে এটি এর রং পরিবর্তন করে। এসিড নীল লিটমাসকে লাল করে কিন্তু যদি এটি ক্ষারকের সাথে যুক্ত হলে এটি এসিডের বিপরীত প্রতিক্রিয়া করবে।ক্ষার লাল লিটমাসকে নীল করবে।

• ফেনোফথ্যালিন এসিডের সাথে যুক্ত হয়ে কোন রঙ পরিবর্তন করবে না অর্থাৎ এটি বর্নহীন অবস্থায় থাকবে। কিন্তু ফেনোফথ্যালিন ক্ষারকের সাথে যুক্ত হয়ে গোলাপি বর্ন ধারন করবে।

• মিথাইল অরেঞ্জ ও নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি এসিডের মধ্যে প্রবেশ করালে বর্ন পরিবর্তন করবে এবং লাল রঙে রূপান্তরিত হবে কিন্তু ক্ষারকের মধ্যে প্রবেশ করালে হলুদ রঙে রূপান্তরিত হবে। 

• অনেক সময় জবা ফুলের রস ও নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং এই নির্দেশক এসিডের মধ্যে প্রবেশ করালে লাল রঙে রুপান্তরিত হবে এবং ক্ষারকের মধ্যে প্রবেশ করালে নীল রঙে রূপান্তরিত হবে। 

মতবাদ: 

বিজ্ঞানীগন এসিড/ অম্ল ও ক্ষারক সম্পর্কে অনেক গবেষণা করেছে এবং অনেক মতবাদ ও প্রকাশ করেছেন কিন্তু সকল মতবাদের মধ্যে ব্রনস্টেড- লাওরির মতবাদ অন্যতম। 

• ব্রনস্টেড – লাওরির মতবাদ : 

ব্রনস্টেড ও লাওরি প্রধানত দুজন ব্যক্তির নাম।  জোহানেস ব্রনস্টেড ও থমাস লাওরি নামের দুজন বিজ্ঞানী অম্ল ও ক্ষারক সম্পর্কে মতবাদ পোষন করেন। এই দুই খ্যাতিমান বিজ্ঞানি ১৯২৩ সালে তাদের মতবাদ প্রকাশ করে।  দুজন দুই ভিন্ন দেশের হয়েও একই মতবাদ প্রদান করে। জোহানেস ব্রনস্টেড যিনি ডেনমার্ক এবং থমাস লাওরি যিনি ইউকের অধিবাসী ছিলেন। এই দুই বিজ্ঞানীদের  মতে এসিড হল,  এমন একটি অণু যা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় প্রোটন ( হাইড্রোজেন আয়ন  H+) দান করতে সক্ষম কিন্তু অপরদিকে  ক্ষারক এসিডের বিপরীতে অর্থাৎ ক্ষারক  হল এমন একটি অণু যা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় প্রোটন গ্রহণ করে। সুতরাং বলা যায় যে,  এসিড বা  অম্ল প্রোটন দান করে অর্থাৎ এসিডকে প্রোটন দাতা এবং ক্ষারক যেহেতু প্রোটন গ্রহন করে সেহেতু  ক্ষারক কে প্রোটন গ্রহীতা বলা হয়ে থাকে।

ক্ষারক: 

এসিডের ন্যায় ক্ষারক ও এক শ্রেণির রাসায়নিক যৌগ।  যে সকল যৌগ জলীয় দ্রবণে সম্পূর্ণরূপে বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোক্সাইড আয়ন (OH–) প্রদান করে তাকে ক্ষারক বলে।  ব্রনস্টেড – লাউরির মতবাদ অনুযায়ী  ক্ষারক জলীয় দ্রবনে   হাইড্রোক্সাইড আয়ন (OH−) প্রদান করে থাকে। ক্ষারক নামক রাসায়নিক যৌগ জলে দ্রবীভূত হয়ে যায় এবং সকল প্রকার  হাইড্রোজেন আয়ন (H+) অবমুক্ত করে দ্রবণের pH এর মান পানির  সাধারন মানের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি করে  অর্থাৎ ৭ এর বেশি করে যা পানির সাধারণ মানের চেয়ে বেশি। অনেক রকমের ক্ষারক রয়েছে কিন্তু সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (NaOH), অ্যামোনিয়া(NH3) উল্লেখযোগ্য এবং  সবচেয়ে প্রচলিত ক্ষারক।

অম্ল বা এসিডের  বিপরীতধর্মী পদার্থ হল ক্ষারক। এই  অম্ল এবং ক্ষারকের মধ্যে বিক্রিয়াকে বলা হয় প্রশমন বিক্রিয়া। এই প্রশমন বিক্রিয়ায় অম্ল ও ক্ষারক বিক্রিয়া করে লবন এবং পানি উৎপন্ন করে।  এই দুইটি রাসায়নিক পদার্থকে   বিপরীতধর্মী পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয় কারণ অম্ল বা এসিড  পানিতে হাইড্রোনিয়াম আয়নের ঘনমাত্রা বৃদ্ধি করে কিন্তু ক্ষারক বিপরীতধর্মী পদার্থ হওয়ায় পানিতে হাইড্রোনিয়াম আয়নের ঘনমাত্রা হ্রাস করে।  ক্ষারক অম্লের সাথে প্রশমন বিক্রিয়া করে লবণ এবং পানি উৎপন্ন করে।

যেমন: NH4OH(ক্ষারক) + HCL(এসিড) ——-> NH4CL(লবণ) + H2O(পানি) 

ক্ষার ও ক্ষারকঃ 

ক্ষার ও ক্ষারক দুইটা ভিন্ন ধর্মী পদার্থ । ভিন্ন ধর্মী পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও সকল প্রকার ক্ষার ক্ষারক নামে পরিচিত কিন্তু আবার সকল ক্ষারক ক্ষার নয়।

যে সকল  ক্ষারক পানিতে দ্রবণীয় অর্থাৎ পানিতে দ্রবীভূত হয় তাদেরকে  ক্ষার বলে কিন্তু আবার অনেক প্রকার ক্ষারক   পানিতে অদ্রবনীয় অর্থাৎ তারা পানিতে দ্রবীভূত হয়না,  তারা ক্ষারক হলেও ক্ষার নয়। 

তাই বলা হয় যে,  সকল ক্ষারকই  ক্ষার  কিন্তু সকল ক্ষার ক্ষারক নয়। 

ব্যবহারঃ 

ক্ষারকের অনেক রকমের ব্যবহার রয়েছে। এমনকি আমরা আমাদের নিত্যদিনের কাজের মধ্যে ক্ষারক ব্যবহার করে থাকি। 

*আমরা আমাদের ঘরবাড়ি পরিষ্কার করার জন্য ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড (Ca(OH)2)ব্যবহার করি।*অনেক প্রকার পোকামাকড় দমন করার উদ্দেশ্যে আমরা ক্ষারক ব্যবহার করি। 

* গ্যাসের সমস্যা নিবারনের জন্য আমরা গ্যাস্ট্রিক জাতীয় ওষুধ গ্রহন করি।  এই গ্যাস্টিক জাতীয়  ওষুধ অর্থাৎ এন্টাসিড তৈরির মূল উপাদান হলো  ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রোক্সাইড(Mg(OH)2)  যা একটি প্রয়োজনীয় ক্ষারক । অনেক সময় এসিড ব্যবহার করার সময় এসিডের পরিমান বেড়ে যায় এবং দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভবনা থেকে যায়। সেই ক্ষেত্রে ক্ষার দিলেই এসিডের পরিমান অনেকাংশে কমে যাবে এবং দুর্ঘটনা থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে।

আরো পড়ুন

লাফিং গ্যাস কি? কৃত্তিম হাস্যরহস্য অজানা নয়

নাসা কি।। কিভাবে সৃষ্টি হল নাসা

গান্ধী পোকা কেন বাজে গন্ধ ছড়ায়?

Leave a Comment